Image description

মানিকগঞ্জের ঘিওরে বানিয়াজুরী ইউনিয়ন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ দাসের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক–কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, লিখিত অভিযোগ, শিক্ষা বোর্ডে তদন্ত—সবকিছু উপেক্ষা করেই বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। সরকারি বাজেটের ৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ভর্তি ফি, বিল-খরচসহ একাধিক খাতের টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানে চলছে অস্থিরতা ও ক্ষোভের বিস্তার। অভিযোগ নিয়ে জেলা প্রশাসক, শিক্ষা বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া এই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে দির্ঘদিন ধরে সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করছে স্কুল-কলেজের সব কার্যক্রম। তার স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে স্বয়ং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও কর্মচারীবৃন্দসহ ২১ জনের স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা তুল ইসলাম।

শুধু শিক্ষকরাই নন, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও। নিয়মবহির্ভূতভাবে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বেতনসহ বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ছাত্র-জনতার অদ্ভূত্থানের পর রবীন্দ্রনাথের অপসারণ চেয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। তারপরও বহাল তবিয়াতেই রয়েছেন আওয়ামী লীগ পন্থী প্রভাবশালী এই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ দাস।

জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরা লিখিত অভিযোগে শিক্ষক ও কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রশাসনিক কাজের জন্য সরকারি বাজেট আনুমোদিত ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে ব্যয় না করে ২১টি খাত দেখিয়ে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৭০০ টাকা নিজে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। টাকা আত্মসাৎতের বিষয় অস্বীকার করলেও উপজেলা হিসাবরক্ষক অফিসে খোঁজ গিয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে।

প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের পোশাকের জন্য সরকারি বরাদ্দ টাকা সংশ্লিষ্টদের না দিয়ে তিনি অবৈধ পন্থায় নিজে আত্মসাৎ করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে। জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগের পর কর্মচারীদের ১৫০০ করে টাকা দিয়েছে বলে জানা যায়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান থেকেও  ইন্টারনেট বিল, কম্পিউটার-সংক্রান্ত খরচ, ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ টাকা উত্তোলন করেন। পানির বিল, আসবাবপত্র, বই ও সাময়িকি, রাসায়নিক দ্রব্য, ক্রীড়াসামগ্রীর ক্রয় দেখিয়েও টাকা উত্তোলন করেছেন। অথচ উল্লেখিত খাতে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি হয়নি বলে শিক্ষকদের অভিযোগ। 

এদিকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ভর্তির টাকা নীতিমালা অনুযায়ী খরচ না করে ব্যক্তিগতভাবে খরচ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সেশনের সরকারি শিক্ষকদের এসিআর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জমা না দিয়ে নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখার অভিযোগ ও তার বিরুদ্ধে। 

সম্প্রতি বানিয়াজুরী ইউনিয়ন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের ভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি এবং শিক্ষকমণ্ডলী একত্র হয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, কর্মচারীদের পোশাকের জন্য সরকারি বরাদ্দ করা টাকা সংশ্লিষ্টদের না দিয়ে তিনি অবৈধ পন্থায় নিজে আত্মসাৎ করেন। প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরির বইয়ের জন্য অর্থ বাধ্য থাকলেও বই সংগ্রহ করছে না।

এদিকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ দাসের কাছে জানতে চাইলে শিক্ষকদের জানিয়ে দেন এ বিষয়ে তার (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) কিছুই জানা নেই। কে বা কারা তার স্বাক্ষর নকল করে এটা করেছে। অধ্যক্ষ নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য গত ১৫ অক্টোবর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সে কমিটিতে রাখা হয়েছিল বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মোনায়েম হোসেন খান, মো. হেলাল উদ্দিন ও মো. নাজিম উদ্দিনকে। গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একাধারে তিন দিন প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকেন। পরবর্তী সময়ে অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানে এলে তার নিজের হাতে গঠিত তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে গেলেন গত ২৬ অক্টোবর রহস্যজনক কারণে তদন্ত কমিটি বাতিল করে আবার পত্র জারি করেন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মনোনয়ন খান বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্যার আমাদের ওপর মানসিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে যা বলে বোঝানো যাবে না। তার অর্থ কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির সীমানা পেরিয়ে গেছে। যার কারণে আমরা বাধ্য হয়ে তার সকল অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি। অভিযোগ করার কারণে আমাদের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। উচ্চপর্যায়ে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম আরো ক্ষুন্ন হয়ে যাবে। আমরা চাই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার।’

তবে জেলা প্রশাসকের কাছে শিক্ষকরা অভিযোগ দেয়ার পর সুর পাল্টে যায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের। তিনি নিজের কিছু ভুলের কথা স্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘টাকা কীভাবে উত্তোলন হয়েছে বিষয়টি আমি বুঝতে পারিনি। আমার হয়তো কোথাও ভুল ছিল। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমি অবগত। তবে শিক্ষকরা আমার বিরুদ্ধে যে  অভিযোগগুলো করেছেন, তা বেশির ভাগই সত্য নয়।  প্রমাণিত হলে সব শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আমার অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ করেছে। কী কারণে করেছে সেটা জানি না।’ 

এ বিষয়ে ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা তুল ইসলাম বলেন, ‘বানিয়াজুরী ইউনিয়ন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত আছি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তদন্তের সেই অভিযোগের কপি বর্তমানে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কার্যালয়ে রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রদান করা হবে।