Image description

একই বই দুজনের প্রয়োজন। একজন পড়ছে, অন্যজন অপেক্ষা করছে। কখনো অপেক্ষা করতে গিয়ে বিরক্তি, কখনো বইটি আগে কে পড়বে, তা নিয়ে ঝগড়া। চাঁদপুরের রূপসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের যমজ বোন আমেনা আক্তার ও আফসানা আক্তারের মাধ্যমিকের পড়াশোনার দিনগুলো কেটেছে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

তাদের বাবা আবদুল আজিজ চায়ের দোকান চালান। দোকানের আয় দিয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি চার সন্তানের পড়াশোনার ব্যয়ও মেটাতে হয় তাকে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানদের বই, খাতা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সব সময় দুই মেয়ের জন্য আলাদা বই কেনা সম্ভব হয়নি।

আমেনা বলেন, ‘অনেক সময় একই বই দুজনের পড়তে হতো। আমার কোনো বিষয় পড়ার দরকার, অথচ বইটা তখন বোনের কাছে। তার পড়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে হতো। কখনো এ নিয়ে আমাদের মধ্যে ঝগড়াও হতো।’

এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় দুই বোনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মতো চায়ের দোকানি পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাগত সাফল্যের স্বীকৃতি দিতে এবং পড়াশোনায় উৎসাহ জোগাতে গত ২৭ অক্টোবর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাম্বার ওয়ান।

‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’ শীর্ষক এ আয়োজনে আমেনা ও আফসানাসহ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ১৩৫ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে তাদেরও সম্মানিত করা হয়। শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় ক্রেস্ট, সনদ, মেডেল, এককালীন শিক্ষা বৃত্তি ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি-২০২৮) আগামী দুই বছর প্রস্তুতির জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থী নাম্বার ওয়ানের পূর্ণ সহযোগিতায় টেন মিনিট স্কুলের একাডেমিক কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছে।

একটি বই ভাগ করে পড়া দুই বোনের এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন

চায়ের দোকানের সীমিত আয় আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলার স্বপ্ন দেখেন অনেক বাবা-মা। তাদের সন্তানদের সেই স্বপ্ন পূরণে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিতে গত তিন বছর ধরে এ আয়োজন করে আসছে নাম্বার ওয়ান।

দুই বোন এবার চাঁদপুর মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে। ভবিষ্যতে দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়তে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তাদের। শিক্ষকতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ করে দিতে চায় দুই বোন।

তাদের ভাষায়, ‘আমরা দুজনই শিক্ষা ক্যাডারে যেতে চাই। শিক্ষকতার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে। আমরা চাই, নিজেরা পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হই এবং শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ করে দিই।’

বাবার চায়ের দোকানের আয় থেকেই চার সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে হয়। দুই মেয়ের সাফল্যে পরিবারে আনন্দ থাকলেও সামনে কলেজের খরচ, বই কেনা এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির ব্যয় সামলানোর বিষয়টিও রয়েছে।

আবদুল আজিজ বলেন, ‘আমার চাওয়া, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। আমি যতটুকু পারি, তাদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করি। মেয়েরা ভালো ফল করেছে, এখন চাই তারা আরও পড়াশোনা করুক এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করুক।’

আমেনা ও আফসানার কাছে এই সহায়তা এসেছে তাদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। কলেজে ভালো ফল ধরে রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতিও নিতে হবে তাদের। দুই বছরের শিক্ষাসহায়তা এবং নাম্বার ওয়ানের সহযোগিতায় টেন মিনিট স্কুলের অনলাইন কোর্স করার সুযোগ তাদের প্রস্তুতিতে কাজে আসবে বলে আশা করছে তারা। আফসানা বলে, ‘আমরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। নাম্বার ওয়ানের সহায়তায় টেন মিনিট স্কুলের কোর্সগুলো আমাদের উচ্চমাধ্যমিকের প্রস্তুতিতে কাজে আসবে। আমরা ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই, যেন ভবিষ্যতে নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি।’

নাম্বার ওয়ানের উদ্যোগ সম্পর্কে এমজিআইয়ের প্রধান হিসাব কর্মকর্তা মো. রহমতুল্লাহ খোন্দকার, এফসিএ, বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া হলে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। চা দোকানি পরিবারের সন্তানদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও সংগ্রাম। নাম্বার ওয়ানের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদেরও সম্মানিত করতে চাই। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য আমরা তাদের পাশে থাকতে চাই। আরও বেশি শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করতে এবং তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করতে আমরা এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চাই।’

কালবেলা