Image description

এবারের এসএসসিত পরীক্ষার ফলাফলে হাসিবুল আলী শোভনের ১১টি পত্রেই সৃজনশীল নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। আইসিটি বিষয়ে সৃজনশীল না থাকায় হয়তো সেখানে পরিবর্তন করা যায়নি। আর এসব পরিবর্তনের সবগুলোই হয়েছে সৃজনশীল অংশে।

উচ্চতর গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে সৃজনশীল অংশে শূন্য পেলেও দেয়া হয়েছে যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৫। এমনকি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে পেয়েছে ২০ কিন্তু দেয়া হয়েছে ৮২। এর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথেরও ১১টি বিষয়ের ফলাফলে পরিবর্তন করা হয়েছিল। তবে সেখানে নৈর্ব্যত্তিক ও সৃজনশীল উভয় অংশেই করা হয়েছিল। 

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনের দায়ের করা মামলার এজাহারে দেখা যায়, বাংলা প্রথম পত্রের সৃজনশীলে পেয়েছিল ২৩ কিন্তু ফলাফলে উল্লেখ রয়েছে ৩৩, এছাড়া বাংলা দ্বিতীয় পত্রে পেয়েছে ২৪ কিন্তু দেয়া হয়েছে ৬২, ইংরেজি প্রথম পত্রে ৩৩ এর স্থলে দেয়া হয়েছে ৮৩, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে ২০ এর স্থলে ৮২, গণিতে ৯ এর স্থলে ৬৬, ইসলাম শিক্ষায় ৭ এর স্থলে ৬৪, উচ্চতর গণিত শূন্য এর স্থলে ৪৬, পদার্থবিজ্ঞানে শূন্য এর স্থলে ৪৫, রসায়নে ১ এর স্থলে ৪৬, জীববিজ্ঞানে ১ এর স্থলে ৪৬ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ে ৪ এর স্থলে দেয়া হয়েছে ৬৫ নম্বর। অর্থাৎ নৈর্ব্যত্তিক ছাড়া সৃজনশীল সব বিষয়ের নম্বর বাড়ানো হয়েছে।

এই নম্বর বাড়ানোর জন্য কাদেরকে দায়ী করা হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে মামলার বাদী ও চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা খুব নিবিড়ভাবে তদন্ত করেছি এবং মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ টিমকেও এই কাজে যুক্ত করেছি। তাদের পরামর্শ ও আমাদের অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের তিন জনের নাম এসেছে। ফরেনসিক রিপোর্টেও এই তিনজনের নাম এসেছে। ’

তিনি আরো বলেন, যে দুটি কম্পিউটার এই রোল নম্বরের (১০৭২৪২) সৃজনশীল অংশের নম্বর স্ক্যান করা হয়েছে সেই দুটি কম্পিউটারে সেই কম্পিউটারে কাজ করেন দুই জন। এছাড়া তারা যে কাজ করেন তা ঠিক আছে কিনা তা সলভ (ভুল ত্রুটি হলে সমাধান করা) করেন একজন। এই তিনজন যোগসাজশ করে এই রোল নম্বরের সৃজনশীল অংশের নম্বর বাড়িয়েছে। তাই আমরা তাদের আসামী করেছি। 

তাহলে শিক্ষার্থীকে আসামী করা হয়েছে কেন? এই প্রশ্নের জবাবে শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন,‘ নম্বর বাড়ানোর ফলে লাভবান হয়েছে শিক্ষার্থী। ১১ পত্রে নম্বর বাড়িয়ে প্রকাশিত ফলাফলে তার জিপিএ ৪.৯৪। তাই আমরা তাকেও আসামী করেছি। একইসাথে তার ফলাফল সার্ভার থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ফলাফল বাতিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। 

এই ঘটনায় কি আরো কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করছেন? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর জহিরুল হক স্বপন বলেন,‘ এই ঘটনায় আর কেউ জড়িত রয়েছে কিনা পুলিশের সিআইডি শাখা তদন্ত করে বের করবে।’

পুন:নিরীক্ষন আবেদনেই সর্বনাশ

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফল পুন:নিরীক্ষনের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তখন নারায়ন চন্দ্র নাথের স্ত্রী বনশ্রী দেবনাথ পাঁচলাইশ থানায় সাধারন ডায়েরি করেছিল যে আমরা আমাদের ছেলের ফলাফল পুন:নিরীক্ষনের জন্য আবেদন করিনি। কে আবেদন করেছে তা বের করা হউক। একইসাথে তাদের সন্তান নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল যাতে পুন:নিরীক্ষণ করা না হয় সেজন্য তৎকালীন শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছিল। শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান তা আমলে নিয়ে নক্ষত্র দেবনাথের উত্তরপত্র পুন:নিরীক্ষণ না করতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে নির্দেশনা দিয়েছিল, সেই নির্দেশনায় তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বোর্ডের সিনিয়র সিষ্টেম এনালিস্টকে চিরকুট লিখেছিলেন যাতে উক্ত শিক্ষার্থীর খাতা পুন:নিরীক্ষনের জন্য আনা না হয়। যদিও পরবর্তীতে গঠিত তদন্ত কমিটিতে ১১টি বিষয়ের নম্বর বাড়ানোর বিষয়টি প্রমানিত হয়। ঠিক একইভাবে হাসিবুল আলী শোভন কিংবা তার বাবা মা কেউ পুন:নিরীক্ষনের আবেদন করেনি বলে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন। তার বাবা আবু শাহেদ হারুন বলেন,‘ আমার ছেলে বা আমার পরিবারের কেউ পুন:নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করিনি। কে করেছে তা জানি না।’

এবিষয়ে বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, নারায়নের ছেলের নম্বর বাড়ানোর বিষয়টি হয়তো বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের কেউ কেউ জানতো। হয়তো তাদের কেউ পুন:নিরীক্ষনের আবেদন করেছিল। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় হাসিবুল আলী শোভনেরও নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি হয়তো কেউ জানতো। আর তারাই হয়তো পুন:নিরীক্ষনের জন্য আবেদন করে তা শনাক্ত করে দেয়ার রাস্তা বের করে দেয়। এখন দেখার বিষয় কে আবেদন করেছে। 

যেসব ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে
পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এর ৫/৬/১২/১৩ এবং পেনাল কোড-১৮৬০ এর ৪২০/৪৬৫/৪৬৬/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪৭৭ক/৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সংক্রান্ত একটি অভিযোগ নিয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হাসিবুূল আলী শোভন এবং শিক্ষাবোর্ডের তিন কর্মচারী ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, রাশেদুল ইসলাম ও নূর হোসেন রায়হানকে আসামী করা হয়েছে।  আমরা এবিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

ঘটনার প্রেক্ষাপট
আগ্রাবাদ সরকারি কলোনী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল হাসিবুল আলী শোভন। তার পরীক্ষার রোল নম্বর-১০৭২৪২, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪.৯৪ পেয়েছিল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর এই শিক্ষার্থীর তিনটি বিষয়ের জন্য পুন:নিরীক্ষনের আবেদন করে। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করতে গিয়ে পদার্থ বিজ্ঞানের সৃজনশীল খাতা শূন্য নম্বর দেখতে পান পরীক্ষক। কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলের প্রাপ্ত নম্বরের জায়গায় ছিল ৪৫। পরবর্তীতে অন্যান্য দুই বিষয়েও এমন অসঙ্গতি দেখার পর বাকি বিষয়গুলোও চেক করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। সেগুলোতেও বাড়তি নম্বরের প্রমাণ পায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ। আর তখনই এঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত বিষয়টি উদঘাটন করে এবং এঘটনায় মামলা দায়ের করে। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ফলাফল সার্ভার থেকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং শিক্ষার্থী কোথাও ভর্তি হতে পারেনি। 

এর আগেও একই বিষয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছিল চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পক্ষ থেকে। তখন মামলা হয়েছিল সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে। তাঁর ছেলের ফলাফল জালিয়াতির ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন শিক্ষাবোর্ডের তৎকালীন সচিব প্রফেসর সামসুদ্দিন আজাদ। এখনো এই মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। নারায়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি তাঁর ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পুন:নিরীক্ষনের সময় ৩৪টি খাতার নম্বরপত্র বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন যেটা ঘটেছিল সেটা হলো পুন:নিরীক্ষনের সময় নিরীক্ষণ শেষে খাতায় প্রাপ্ত নম্বর লিখেছিল পুন:নিরীক্ষণের পরীক্ষক। কিন্ত নিরীক্ষনের ফলাফল শিটে ৩৪টি উত্তরপত্রে বাড়তি নম্বর ইনপুট দেয়া হয়েছিল। পরে তা শনাক্ত করে সঠিক প্রাপ্ত নম্বর বসিয়ে নিরীক্ষণের চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করেছিল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর।

উল্লেখ্য, এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন পাশ করে। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজারর ৩৯৮ জন। ফলাফল পুন:নিরীক্ষনের জন্য আবেদন করেছে ৩৯ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। পুন:নিরীক্ষণে এসএসসিতে প্রকাশিত ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে নতুনভাবে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৩ জন, ফেল থেকে পাশ করেছে ১৯০ জন।