রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের নাম সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সরবরাহে হল প্রশাসন অস্বীকৃতি জানানোয় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্টের কক্ষ থেকে সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে নিয়েছেন ক্ষুব্ধ সাংবাদিকেরা।
অন্যদিকে, হামলার তীব্র সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দুই সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দপ্তর থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে হামলায় সরাসরি জড়িত ছাত্রদল নেতাদের নাম উল্লেখ না করে বিষয়টিকে ‘কতিপয় শিক্ষার্থীর উসকানিমূলক বক্তব্য ও গোলযোগ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
রোববার রাতে হামলার দৃশ্য, ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কতিপয় শিক্ষার্থী উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করছে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়।
তবে হামলায় যুক্ত সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নাম না থাকায় এই বিজ্ঞপ্তিকে ‘দায়সারা ও আপসকামিতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকেরা।
রোববার রাতে হামলার দৃশ্য, ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া এদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাংবাদিকেরা হামলার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্টের কক্ষে যান। হল প্রভোস্ট ফুটেজ হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালে উপস্থিত সাংবাদিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রমাণ যাতে কোনোভাবে নষ্ট বা পরিবর্তন করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে তারা প্রভোস্টের কক্ষ থেকে সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে নিজেদের হেফাজতে নেন।
সাংবাদিকেরা জানান, এটি ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি। হামলার সঙ্গে জড়িতদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ অত্যন্ত জরুরি। ফুটেজ সংগ্রহের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হার্ডডিস্কটি ফেরত দেওয়া হবে।
সাংবাদিকেরা জানান, এটি ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি। হামলার সঙ্গে জড়িতদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ অত্যন্ত জরুরি। ফুটেজ সংগ্রহের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হার্ডডিস্কটি ফেরত দেওয়া হবে।
ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতিতে সারা দেশে সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ।
অন্যদিকে, ঘটনায় জড়িত থাকা সত্ত্বেও রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকদের ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিকারী সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা ও জিয়া হলের জিএসকে ধরতে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়, যা তারা প্রতিহত করেছেন মাত্র।
এর আগে রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হন। আহত সাংবাদিকেরা হলেন: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ জামান কোরবান, দৈনিক আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল এবং দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু। তাদের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং পরবর্তীতে রাত ১০টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, বিশ্ববিদ্যাালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি এম আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম ও কর্মী বিশাল চক্রবর্তীসহ অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী এ হামলায় সরাসরি অংশ নেন।
হামলার প্রতিবাদে রাতেই জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে জিয়া হলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকেরা। পরবর্তীতে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম ঘটনাস্থলে গিয়ে সোমবারের মধ্যে মামলার প্রতিশ্রুতি দিলে রাত সোয়া ১টার দিকে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার, জড়িতদের ছাত্রত্ব বাতিল এবং বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।