Image description

বাংলাদেশের কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির মোট আসন প্রায় ২৫ লাখ; তবে ভর্তির আবেদন পড়েছে সব মিলিয়ে ১০ লাখের মতো। অর্থাৎ, একাদশ শ্রেণিতে অর্ধেকের বেশি আসন যে ফাঁকা থাকছে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

যেমন, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে তিন লাখের বেশি আসন থাকলেও ভর্তির জন্য প্রথম দফায় আবেদন করেছেন ৯৩ হাজার শিক্ষার্থী।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে মোট আসন সংখ্যা দেড় লাখের কিছু বেশ; আর এবছর ওই বোর্ডে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশ করেছেন ৪৪ হাজার ৫৫৫ জন শিক্ষার্থী।

অর্থাৎ, এই দুই বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে আবেদন করার মতো যোগ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাই মোট আসনের তিন ভাগের এক ভাগও নয়।

এই তথ্যই বলে দেয় এবছর একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংকট নিয়ে কতটা জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছে অনেক কলেজ।

বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকাতেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক আসন শূন্য থাকবে।

২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রথম পর্যায়ের ফল প্রকাশের পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কারণ এবছর পাশের হারও ছিল বেশ কম।

ফলে ধারণা করা গিয়েছিল, দেশের অনেক কলেজই পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষার্থী পাবে না, এমনকি একাদশ শ্রেণিতে শূন্য ভর্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়বে।

কিন্তু, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, কম বা শূন্য শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে কীভাবে- এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।

এছাড়া দেশে যখন লাখ লাখ শিক্ষার্থী 'ভালো' কলেজে ভর্তির জন্য হাহাকার করে, তখন অনেক প্রতষ্ঠানে এত আসন ফাঁকা থাকে কেন- এই বিতর্কও হচ্ছে।

শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবস্থা যে বাংলাদেশে এবারই প্রথম ঘটেছে বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির এই ধারা চলছে।

অথচ কয়েক বছল আগেও মাধ্যমিক ও সমমান পাস করা শিক্ষার্থীরা আসন সংকটের কারণে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে কি না, এ নিয়ে সমালোচনা হতো।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস,Getty Images

ছবির ক্যাপশান,কলেজের সংখ্যা কমিয়ে লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির কথা বলছেন শিক্ষাবিদরা, প্রতীকী ছবি

সংকট যেখানে

২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। যেখানে পাস করেছেন ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

অর্থাৎ দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসনের বিপরীতে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম।

ফলে একাদশ শ্রেণিতে বিপুল সংখ্যক আসন যে ফাঁকা থাকবে এটি অনেকটা নিশ্চিতই ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো কীভাবে, আর এর ফলে কী সংকট অপেক্ষা করছে?

২০১৮ সালেও বাংলাদেশে সব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না, এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি অনেকটা উল্টে গেছে।

এখন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে।

শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত শিক্ষাবর্ষে চার দফায় আবেদনের সুযোগ দিয়েও ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখের বেশি আসন খালি ছিল।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা মহামারি পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশে একাদশ শ্রেণিতে আসন ফাঁকা থাকার ঘটনা ঘটছে।

২০২১ সালে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। কারণ ওই সময় মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস করতে দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস,NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,দেশের অনেক কলেজেই শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলছেন, প্রয়োজন নেই জানার পরও অনেক এলাকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় অসংখ্য কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে একদিকে শিক্ষকরা যেমন সংকটে পড়ছেন অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপচয়ও বাড়ছে।

"কলেজে শিক্ষার্থী না থাকলে শিক্ষকদের জন্যও অনিশ্চয়তা। এমপিও না থাকলে শিক্ষকদের চিন্তা, আর যদি এমপিও থাকে তাহলে কোটি কোটি টাকা সরকারের অপচয়," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ইসলাম।

নিয়ম অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না বা অনুমোদিত আসনের তুলনায় অর্ধেকের কম শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আসন সংখ্যা কমানো বা পর্যায়ক্রমে অনুমোদন বাতিল করার বিধান যেমন রয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন শূন্য ভর্তি থাকলে পাঠদানের অনুমতি বা এমপিও বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া যায়।

মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শূন্য ছিল এমন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরতদের ডাকিয়েছি, কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি, সামনের বছর পাশের হার না বাড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন অঙ্গীকারনামা নিয়েছি। কলেজে শূন্য ভর্তি বা কম শিক্ষার্থী পাওয়া প্রতিষ্টানকেও ডাকবো।"

শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নামকরা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মের বাইরে আসন সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টিও অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী না পাওয়ার একটি কারণ।

শিক্ষাবোর্ডের একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, "মন্ত্রণালয় থেকে প্রভাব খাটিয়ে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেড়শ আসনের জায়গায় তিনশ আসন করে নিয়েছে। এমনকি এখনো এমন কাজ চলছে।"

এক্ষেত্রে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ বছর এসএসসিতে পাশের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই কমেছে, প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস,Getty Images

ছবির ক্যাপশান,এ বছর এসএসসিতে পাশের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই কমেছে, প্রতীকী ছবি

সমাধান হবে কীভাবে?

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল কেবল ফল বিপর্যয় নয়, এর ফলে কলেজ-পর্যায়ে একটি বড় কাঠামোগত প্রশ্নও সামনে এনেছে বলেই মনে করেন শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগ বা জেলা পর্যায়ের কিছু কলেজে তীব্র প্রতিযোগিতা। বাকি হাজার হাজার কলেজে শিক্ষার্থীরা যেতে চায় না। কারণ সেখানে ভালো শিক্ষক না থাকা, ফলাফল খারাপ হওয়া, প্রাকটিক্যাল ক্লাস না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে শহরমুখী অভিবাসনের কারণে গ্রামের কলেজগুলো ফাঁকা হচ্ছে, শহরের কলেজে চাপ বাড়ছে।

বেসরকারি কলেজগুলোর আয়ের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের বেতন ও ভর্তি ফি। শিক্ষার্থী কম মানে আয় কম। আয় কম মানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থতা।

সব মিলিয়ে একাদশ শ্রেণির ভর্তির এই চিত্র নানামুখি জটিলতার তৈরি করছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, কেবল নতুন কলেজ খোলা নয়, বিদ্যমান কলেজগুলোর আসন, শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষার মান বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সেটি করা না হলে প্রতি বছর একদিকে নামী কলেজে ভর্তির চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি বহু কলেজে শূন্য আসনের বিপরীত চিত্র আরও প্রকট হবে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন, এই সংকটের অন্যতম কারণ অপরিকল্পিতভাবে কলেজের বিস্তার এবং শিক্ষার মানের তুলনায় শিক্ষার হারকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া।

২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস,Getty Images

ছবির ক্যাপশান,২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে শিক্ষার্থীরা

তিনি বলছেন, গত দেড় দশকে দেশে কলেজের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায়, স্থানীয় প্রভাবে অনেক জায়গায় প্রয়োজন ছাড়াই কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে নামে কলেজ আছে, কিন্তু শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে।

"অনুমোদন দেওয়া হয়েছে অর্থবিত্ত, ক্ষমতার বিচারে- নীতিমালা মানা হয়নি। ফলে নিয়ম মেনে যেহেতু হয়নি, অনেক প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থী শূন্য থাকছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন রাশেদা কে চৌধুরী।

এক্ষেত্রে কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।

তিনি বলছেন, "দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা তৈরি করা হয়েছে, এখন নীতিগতভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।"

তবে শিক্ষার মান নিয়েও যেহেতু প্রশ্ন রয়েছে, ফলে এই সমস্যার সমাধান করা কঠিন হবে বলেই মনে করেন মিজ চৌধুরী।

"এই সমস্যার এক কথায় কোনো সমাধান নেই। এটা একটা জটিল রূপ নিয়েছে। ফলে দীর্ঘ পরিকল্পনা দরকার। নীতিনির্ধারকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এই সমস্যার সমাধানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান বাড়াতে সরকার শিক্ষা বোর্ডগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বলে একাধিক শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।

"আমি যে শিক্ষার্থীদের পাঠাবো অন্য কলেজে, মান না থাকলে তো সম্ভব না। এটা তো শিক্ষার্থীদের অধিকার, ভালো মানের কলেজে পড়া। দূর্বল কলেজগুলোর মান বাড়াতে সরকার আমাদেরও নির্দেশনা দিয়েছে, সময় লাগবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান।