Image description

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা গত ২৯ জুলাই ‘Entrepreneurship And Small Business Development’ কোর্সের অ্যাসাইনমেন্টের উপরের পাতায় (কভার পেজ) ৩২ শিক্ষার্থী নিজ শিক্ষকের ইংরেজী নাম ‘Morioum Hasna’ না লেখে লিখলেন ‘Morium Hasna’ শিক্ষক বিষয়টা লক্ষ্য করে ৩২ শিক্ষার্থীকে নিজ নামের স্পেলিং(বানান) ৩শত বার লেখে আনার জন্য দিলেন পুনরায় অ্যাসাইনমেন্ট। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চলছে আলোচনার ঝড়। 

জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কোর্সের ‘Growth of Entrepreneurship in Bangladesh’ টপিকের উপর দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টি শিক্ষক দেখার সময় একটি অ্যাসাইনমেন্টের কভার পেজের উপর নজর পড়ে। তখন তিনি তার নামে স্পেলিং মিল না থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করেন। পরে একই স্পেলিং মোট ৩২টি অ্যাসাইনমেন্টে দেখেন। তখন তিনি ৩২জন শিক্ষার্থীকে ৫০০ বার নিজের নামের স্পেলিং এর অ্যাসাইনমেন্ট দেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছে নিজেদের ভুল স্বীকার করে অ্যাসাইনমেন্ট রি-সাবমিশন দেওয়ার কথা জানান। কিন্তু শিক্ষক তাতে রাজি হননি। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে ৫০০ বার থেকে কমিয়ে ৩০০ বার নামের স্পেলিং অ্যাসাইনমেন্ট দেন শিক্ষক। 

শিক্ষার্থীদের এই ভুল হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, তারা একজনের অ্যাসাইনমেন্টের কভার পেজ অন্য জন কপি করার ফলে ক্রমান্বয়ে ভুলটি (সেইন মিস্টেক) হয়।

ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম হাসনা বলেন, ‘স্টুডেন্টরা ওইদিন (২৯ জুলাই) জমা দেওয়ার পর আমি অ্যাসাইনমেন্টগুলো দেখছিলাম আর ওদের কাছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিলাম। হঠাৎই আমার চোখ যায় একটি কভার পেজে। দেখলাম সেখানে Course Teacher অর্থাৎ আমার নামের বানানটি ভুল। কৌতুহল বশত আরও কিছু অ্যাসাইনমেন্টের কভার পেজে চোখ বুলালাম। আমার ওই ব্যাচে স্টুডেন্ট সংখ্যা ৫৮ জন। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম তাদের মধ্যে ৩২ জনই তাদের Course Teacher এর নামের বানান ভুল লিখেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব স্টুডেন্টদের খুঁটিনাটি সব ভুলভ্রান্তি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। কারণ কোর্স অ্যাসাইনমেন্টের মতো একটা ফরমাল পেপারে Course Teacher এর নামের বানান ভুল এক ধরনের দায়িত্বে অবহেলা। আমার এই স্টুডেন্টরাই একদিন বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে, কেউবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বাইরে যাবে। সেখানে নামের বানান লেখার এই ধরনের অবহেলা হয়ত ভোগান্তির কারণ হতে পারে। কারণ আজকের ডিজিটাল যুগে বানানের একটা Letter তো দূরের কথা একটা Character ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়াই অনেক সময় আটকে যায়। পরিচিত অনেকেই এর শিকার হয়েছে, এটা এখনকার বাস্তবতা।’ 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘দুই/একজন এই ভুলটা করলে সেটা তাদের ডেকে বুঝিয়ে বলতাম। কিন্তু একটা পুরো ব্যাচের ৫৮ জনের ৩২ জনই যখন ভুল করে তখন বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশেষ কেউ না। আমার নামের বানান ভুল বা শুদ্ধ লিখলে আমার কিছু যাবে আসবে না। কিন্তু একটা Formal Academic Paper এ আমার স্টুডেন্টদের এমন ভুল সম্পর্কে সতর্ক করা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, এবং সেটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেই দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে যারা Course Teacher এর নামের বানান ভুল করেছে তাদের সবাইকে (৩২ জন) ৩০০বার নামের বানান সঠিকভাবে লিখে আনার কাজ দেই।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গতকাল চোখে পড়লো আমারই এক স্টুডেন্ট বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন এবং সেটা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টি দেখে পজিটিভলিই নিয়েছিলাম, যে আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে হয়ত আরও বেশিসংখ্যক স্টুডেন্টের নজরে আসবে। ফলে তারা ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হবে। কিন্তু বিষয়টি আর ওই পর্যায়ে থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাইরের নানা পেইজ থেকে আমার ছবি ব্যবহার করে একের পর এক পোস্ট করা হচ্ছে। আজ সকাল থেকে লক্ষ্য করলাম বিভিন্ন অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসা শুরু হয়েছে।’ 

‘যা আমার ব্যক্তিগত জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। একটা ক্লাসরুমের বিষয় যে এমন আকার ধারণ করতে পারে সেটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। যারা এসব করছেন তাদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। শুধু আক্ষেপ একটাই আমাদের শিক্ষার্থীদের বড় বড় ক্যারিয়ার গঠনে শিক্ষক হিসেবে আমরা হয়ত কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারছি। কিন্তু অনেককেই দায়িত্বশীলতা শেখাতে পারছি না। শিক্ষক হিসেবে সেই ব্যর্থতা আমাদেরই।’ 

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাইদ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ব্যতিক্রমী এই অ্যাসাইনমেন্টের কথা শেয়ার করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পেজ সাইদুলের বিষয়টি শেয়ার করেন। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি গণমাধ্যম ফটো কার্ড করে তাদের পেজে শেয়ার করে, যা মুহূর্তে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

নামের স্পেলিং প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সহযোগী অধ্যাপক মো. শহীদুল্লা কায়সার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে তিনি বলেন, আমার নাম কেউ সঠিকভাবে লিখতে পারে না বেশিরভাগ সময়। আমার শহীদুল্লা’র ‘হ’ নেই। কায়সার লিখে, কাউসার। মো. এর ফুল ভার্সনও লিখে। তবে আমি অফিসিয়াল কাজে কারো সঠিক বানানো নাম লেখার পক্ষপাতী। বাট, এটার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। ভালো করে বুঝিয়ে বললেই হয়।

শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাইদ বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্টের ভুলটি আমরা স্বীকার করে নিই এবং অ্যাসাইনমেন্ট রি-সাবমিশনের কথা ম্যামকে জানাই। কিন্তু ম্যাম একমত না হয়ে তার সঠিক নাম লিখে আনার নির্দেশ দেন। ম্যামের নির্দেশ মোতাবেক আমরা পরবর্তী ক্লাসে ৩০০ বার ম্যামের সঠিক নাম লিখে আনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব ব্যতিরেকে আমি আমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে একটি পোস্ট করি। কিন্তু পরবর্তীতে তা ভুলভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষককে অসম্মান করার কোনো উদ্দেশ্য আমার আদৌ ছিল না।’