ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও একাডেমিক-প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ স্পষ্ট করা হয়নি। উল্টো তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষক সমিতি ও আইনজীবীদের অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী নির্ধারিত তদন্ত হয়নি। তারা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছেন।
গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক আফরোজা শেলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলামকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথা জানানো হয়।
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনের ক্ষেত্রে এমফিল-পিএইচডি গবেষণাপত্রে চৌর্যবৃত্তির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানানো হয়।
গত ২২ জুনের সিন্ডিকেটসভায় তিনজন শিক্ষককে সাময়িক বহিষ্কার এবং কয়েকজনকে একাডেমিক-প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩-এ স্পষ্ট বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার কারণে বরখাস্ত করা যাবে। তবে অনুসন্ধান কমিটির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে অনুসন্ধান কমিটির সামনে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত জানান, তদন্ত কমিটি তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে তিনি নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জেনেছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা তিনি জানেন না।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া আরেকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। নতুন ঝামেলা এড়াতে তিনি নাম প্রকাশ করতে চান না।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জীনাত হুদা টাইমসকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে অনেক শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্তকে মুখোমুখি করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এতে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিরত রাখার বিষয়টি আদৌ ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে আছে কি না।
আইন কী বলছে?
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব টাইমসকে বলেন, বরখাস্তের আগে তদন্ত কমিটিকে অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ করে বক্তব্য শোনার সুযোগ দিতে হবে। শোকজ না দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া বেআইনি। সংশ্লিষ্টরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরোধিতা বা রাজনৈতিক অবস্থানকে চাকরিচ্যুতির ভিত্তি করা যায় কি না।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সমর্থন বা বিরোধিতা নিজে কোনো অপরাধ নয়’।
তার অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধমূলকভাবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন ‘অতীতে এমন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি’ ।
একাধিক শিক্ষক জানান, কারও রাজনৈতিক অবস্থান পছন্দ না হলে সেই কারণে চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্ত যথাযথ নয়।
কীভাবে কী হয়েছে
বিএনপিপন্থি সাদা দল এবং জামায়াতপন্থি ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) উপাচার্যের কাছে আওয়ামী লীগ সমর্থক নীল দলের শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দেয়। তারা দাবি করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এই শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরোধিতা করে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট চার সদস্যের কমিটি গঠন করে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সব নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক’ প্ল্যাটফর্মের জমা দেওয়া ১২৫ শিক্ষকের তালিকাও তদন্ত কমিটি পর্যালোচনা করবে।
উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক কোনো শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে প্রয়োজনে সেই সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত করা হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য, এসব সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক সাদেকা হালিম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তিনি মন্তব্য করবেন না। অভিযুক্ত অন্য শিক্ষকরা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, সেই কারণে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
অভিযুক্ত শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিতে কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হলে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ফ্যাক্টস সঠিক বলে প্রমাণিত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।’
একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা শিক্ষকদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের পর ওই শিক্ষককে প্রতিনিধিংসহ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে থাকা বিষয়গুলো প্রমাণিত হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সমালোচনার জবাবে আলমোজাদ্দেদী বলেন, ‘৫ আগস্টের পর এই বিশ্ববিদ্যালয় এই ধরনের শিক্ষক সমিতিকে স্বীকৃতি দেয় না। তাই শিক্ষক সমিতি বিবৃতি দিল কি না, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নজর দিতে আগ্রহী নয়।’