রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আল-হেরা কলেজে শিক্ষার্থী রয়েছেন মাত্র ২৭ জন। অথচ তাদের পাঠদান এবং প্রতিষ্ঠানটি দেখভালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২৮ জন। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে কলেজটি উপস্থিত ছিলেন ২৩ শিক্ষক-কর্মচারী। ফলে বাকি পাঁচজন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু তাই নয়; প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৫ জন দেখানো হলেও পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৭ জন। অর্থাৎ ২৭ শিক্ষার্থীর দেখভাল এবং পাঠদানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী দেখানো হয়েছে ২৮ জন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি বছর সরকারের ব্যয় হচ্ছে কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় কলেজটির এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) স্থগিত বা বাতিলের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
সম্প্রতি আল হেরা কলেজ পরিদর্শন করেন ডিআইএর শিক্ষা পরিদর্শক মো. আফরুজ জামান, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ড. মো. সোহেল রানা এবং অডিটর মো. ফজলুল হক। পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির নানা আর্থিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে। এসব অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম শহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারিত মানদণ্ডের অনেক নিচে থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন নিচ্ছেন, যা সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৫ জন দেখানো হলেও পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৭ জন। অর্থাৎ ২৭ শিক্ষার্থীর দেখভাল এবং পাঠদানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী দেখানো হয়েছে ২৮ জন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি বছর সরকারের ব্যয় হচ্ছে কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় কলেজটির এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) স্থগিত বা বাতিলের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ডিআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটিতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৯৫ জন। এর মধ্যে একাদশ বিজ্ঞান বিভাগে ৬ জন, মানবিকে ২৮ জন ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১৪ জন এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ৮ জন, মানবিকে ২৬ জন ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তবে পরিদর্শনের দিন কলেজে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৭ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় একটি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে কমপক্ষে ৫০ জন, মানবিক বিভাগে ৭০ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। অর্থাৎ ন্যূনতম ১৯০ জন শিক্ষার্থী বাধ্যতামূলক। কিন্তু আল হেরা কলেজে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, প্রতিষ্ঠানটির এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও নীতিমালার নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বোর্ড পরীক্ষায় বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ মিলিয়েও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। ফলে এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত বা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
কলেজটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়ম উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে। ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মাণ, মেরামত, খেলাধুলা, গ্রন্থাগার, আপ্যায়ন, মনিহারি, আসবাবপত্র ও অন্যান্য ব্যয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। তিন অর্থবছরে ৩৮ হাজার টাকার বেশি ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে পরিদর্শন দল।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফি ও বেতন নগদে আদায়, প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যাংকে জমা না রেখে হাতে রাখা, নিয়মিত বাজেট প্রণয়ন না করা, ক্রয় কমিটি ছাড়াই কেনাকাটা, ক্যাশবুকে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন না থাকা, ভাউচার ও অনুমোদনের ঘাটতি, এক খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয়সহ একাধিক আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব অনিয়মের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নানা দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নিয়মিত কমিটি গঠন করা হয়নি। স্টক টেকিং কমিটি নেই, বার্ষিক স্টক টেকিং করা হয় না এবং স্টক, ডিমান্ড, ডেসপাচ, চেক ও সাবসিডিয়ারি রেজিস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও সংরক্ষণ করা হয়নি।
আল হেরা কলেজের অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ডিআইএ। গত তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা, নিয়মিত শিক্ষক সভা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস, কাউন্সেলিং, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাবের কার্যকর ব্যবহার, পাঠাগার সমৃদ্ধকরণ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
অবকাঠামোগত দিক থেকেও কলেজটির নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিআইএ। মাত্র দুটি ভবন ও ১৫টি কক্ষ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। টিনশেড শ্রেণিকক্ষে গরমের সময় পাঠদান ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব, মেয়েদের জন্য মানসম্মত কমনরুম না থাকা, নিরাপদ পানির সীমাবদ্ধতা, বিজ্ঞান বিভাগের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং পাঠাগারে প্রয়োজনীয় বই না থাকায় শিক্ষার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, আধুনিক ভবন নির্মাণ, শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর।