পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতাধিক ছাত্রী হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘ম্যাস হিস্টিরিয়া’র কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। একজনকে দেখে অন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
বুধবার দুপুরে ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি উচ্চ বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। অসুস্থ ছাত্রীরা সবাই ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণির ছাত্রী।
খবর পেয়ে দমকল বাহিনী ও স্থানীয় ছোট ছোট যানবাহনে করে অসুস্থ ছাত্রীদের ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মুলাডুলি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক শফিকুল ইসলাম বলেন, বুধবার বেলা একটার দিকে তিনতলায় অবস্থিত ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম শ্রেণির তিন-চারজন ছাত্রী হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে যায়। এ সময় প্রচণ্ড গরম ছিল। পরে বৃষ্টি শুরু হয়। আমরা দ্রুত তাদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। ওই ছাত্রীদের পর একে একে আরও অনেক ছাত্রীদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আবার কেউ জ্ঞান হারিয়ে শ্রেণিকক্ষেই লুটিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্কুলজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বাসনা রানী জানান, তৃতীয় তলায় ৬ষ্ঠ শ্রেণির তিন নম্বর কক্ষে বেঞ্চের নিচে একটি উকুননাশক স্প্রের বোতল পাওয়া গেছে। বোতলটির মুখ খোলা ছিল। কোনো ছাত্রী বোতলটি নিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি। ওই বোতল থেকে কোনো রাসায়নিক বের হয়ে এমন হলো কি না, বোঝা যাচ্ছে না।
সুস্থ কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী একটি ছোট কৌটা হাতে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার সময় কৌটাটি তার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। এর পর থেকে একে একে অন্য ছাত্রীরা শ্বাসকষ্ট, বমি ও খিঁচুনি দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ফায়ার সার্ভিসে ফোন দিয়ে জানানো হয়। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সহায়তায় ৬৫ জনকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অন্যদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পরে সেখানে চিকিৎসা শুরুর পর অনেকেই সুস্থ বোধ করায় অভিভাবকরা তাঁদের বাড়ি নিয়ে গেছেন।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. কাবেরী সাহা বলেন, হঠাৎ করেই হাসপাতালে স্কুল ড্রেস পরা অনেকগুলো শিক্ষার্থীকে অসুস্থ অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। সবাইকে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। প্রয়োজনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে। আর অন্যরা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। এটা মূলত ম্যাস হিস্টিরিয়া হতে পারে। ভয়ের কিছু নেই।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, এত ছাত্রী একযোগে কেন অসুস্থ হয়েছে, বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়। তবে যতটুকু জেনেছি, ৬ষ্ঠ শ্রেণির ওয়াশরুমে একটি কীটনাশকের বোতল দেখতে পায় ছাত্রীরা। সেখান থেকে কোনো বিষাক্ত গ্যাসের মতো কিছু বের হয়ে এমনটা হতে পারে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এটা ম্যাস হিস্টিরিয়া। ভয়ের কিছু নেই। সবাই সুস্থ আছে।
ইউএনও আরও জানান, এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকেও বিষয়টি তদন্ত করতে বলা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে বা ওয়াশরুমে কীটনাশকের বোতল কোথা থেকে এবং কীভাবে এলো, তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুর রহমান জানান, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন কেউ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, কেউ শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ম্যাস হিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা হলো একদল মানুষের মধ্যে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া একই ধরনের শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ। এটি সাধারণত প্রচণ্ড ভয়, উদ্বেগ বা সামাজিক উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট একটি গণমনস্তাত্ত্বিক ঘটনা, যেখানে একে অপরকে দেখে লক্ষণগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।