ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’-তে শিশু খাদ্য সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উদ্বোধনের দিনেই খাবার পায়নি লাখো শিক্ষার্থী। বরাদ্দের টাকা নয়-ছয়ের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনসহ তালিকাভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শিশু খাদ্যের মধ্যে দেওয়ার কথা রয়েছে ফর্টিফাইড বিস্কুট, বনরুটি, ডিম, মৌসুমী ফল এবং ইউএইচটি দুধ।
এদিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারার ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রথম দিনেই খাবার পায়নি প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ বিরাজ করছে। রবিবার (২৯ মার্চ) সকালে উপজেলার আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রথম দিন ছিল। বিদ্যালয়ে ৩৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও দুপুরে ৩০২ জনের জন্য দুটি বন ও একটি ডিম পৌঁছাতে সক্ষম হন এনজিও সংস্থা স্বদেশ পল্লীর নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্ব খাদ্য প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর থেকে এ প্রকল্প কাগজে-কলমে শুরু হয়। এতে জেলার ফুলপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, ধোবাউড়া এবং হালুয়াঘাটসহ পার্শ্ববর্তী জেলার মোট ১০টি উপজেলার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো স্থান পায়।
বাস্তবে কর্মসূচি শুরুর ১৩দিন পর অর্থাৎ গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে খাবার দেয়ার কথা শিক্ষার্থীদের। কিন্তু খাবার সরবরাহ না করেই প্রকল্পের শুরু দিন থেকে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও কর্মসূচির শুরুতেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে পচাঁ-বাসি কলা এবং বনরুটি শিশুদের খাবার হিসাবে সরবরাহ করার অভিযোগ ওঠে। ফলে বিষয়টি গড়ায় বিভাগীয় প্রশাসনে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচিতে ময়মনসিংহ বিভাগের আরও ১০টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও কর্মসূচির প্রথম দিনেই খাবার পায়নি ৫টি উপজেলার প্রায় ৬ শতাধিক বিদ্যালয়ের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। এতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে তালিকাভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে।
সম্প্রতি এক সভায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার মিজ ফারাহ শাম্মী। ঢাকায় একটি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার মিজ ফারাহ শাম্মীর বক্তব্য জানা যায়নি।
রবিবার (২৯ মার্চ) প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচিতে ময়মনসিংহ বিভাগের আরও ১০টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও কর্মসূচির প্রথম দিনেই খাবার পায়নি ৫টি উপজেলার প্রায় ৬ শতাধিক বিদ্যালয়ের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। এতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে তালিকাভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে।
জানতে চাইলে গৌরীপুর উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একাধিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কর্মসূচির প্রথম দিনে খাবার পায়নি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া কারা খাবার সরবরাহ করছে বা করবে, তাও আমাদের জানা নেই।’
এদিন বিকাল ৪টায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা রুবাইয়া বলেন, ‘শুনেছি বিকেলে পৌরসভার কয়েকটি স্কুলে খাবার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ সংক্রান্ত তথ্য আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে জেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু ইউসুফ খান বলেন, ‘খাবার সরবরাহ সংক্রান্ত কোনও তথ্য আমার কাছে নেই। তবে মাস শেষে উপজেলা থেকে প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।’
সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ জেলার ৪টি উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী মোট ১০টি জেলার স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ঠিকাদার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ঢাকার আইসল্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের কর্নধার শাহাদাত হোসেন। অপরদিকে দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচিতে ঠিকাদার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ঢাকার বাবু বাজার এলাকার সমতা ট্রেডার্সের কর্ণধার কাউছার আহম্মেদ। এতে ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ নেত্রকোনা ও শেরপুর জেলার ১০টি উপজেলা তালিকাভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষককের অভিযোগ, অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডধারী ইউনির্ফম পরিহিত ব্যক্তিরা মানসম্পন্ন শিশু খাবার সরবরাহ করবেন। কিন্তু এ নির্দেশনা অমান্য করে গোপন চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় ঠিকাদাররা এ খাবার সরবরাহ করছে। এতে ড্রফ আউট শিশুদের খাবার না দিয়ে অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার মাহাবুব বলেন, আমি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রথম থেকেই ফুলপুর, ধোবাউড়ায় কাজ করছি। এ কারণে কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপেও যুক্ত হয়েছি। এতে ময়মনসিংহের ১টি, নেত্রকোনার ৭টি এবং শেরপুরের ২টি উপজেলা রয়েছে।
এসব উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্তদের অপরাগতার কারণে কর্মসূচির প্রথম দিনে (২৯ মার্চ) ১০টি উপজেলার মধ্যে ৫টিতে প্রথম দিনে খাবার পায়নি। উপজেলাগুলো হল- গৌরীপুর, নেত্রকানা সদর, বারহাট্টা, নকলা এবং নালিতাবাড়ী। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জানতে চাইলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আইসল্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের কর্ণধার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়েছি- কর্মসূচির প্রধমদিনে ৫টি উপজেলায় খাবার সরবরাহ হলেও অন্য ৫টি উপজেলায় খাবার সরবরাহ হয়নি। এটি দুঃখজনক।’
এ সময় অধিদপ্তরের নির্দেশনার ব্যত্যয় এবং প্রথম পর্যায়ের কর্মসূচিতে বরাদ্ধের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ের কর্মসূচিতে খাবার সরবরাহের অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত চলছে। এরই মাঝে বিগত ঈদের আগে কর্মসূচির প্রধম ধাপের ৩ মাসের বিল দেওয়া হয়েছে। তবে বিতর্কিত ১৩ দিনের বিল বর্তমানে বকেয়া রয়েছে।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে ঠিকাদার দেওয়া না হলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়, তুলে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এ কারণে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সমাঝোতার মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি।’
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের ভেতরে অগ্রযাত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরস্বতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুধকুমড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ প্রায় ৪০টি বেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পায়নি স্কুল ফিডিংয়ের প্রথম দিনেই খাবার।
‘স্থানীয়ভাবে ঠিকাদার দেওয়া না হলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়, তুলে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এ কারণে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সমাঝোতার মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি।’ -ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আইসল্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের কর্ণধার মো. শাহাদাত হোসেন
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সকাল থেকে ১১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অধীর আগ্রহে ছিল, তারা আজ খাবার পাবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকগনও শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জানিয়ে দেয় স্কুল ফিডিংয়ের মাধ্যমে তাদের খাবার দেওয়া হবে। কিন্তু স্কুল ফিডিংয়ের খাবার উপজেলার ১১০টি বিদ্যালয়ে প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী খাবার পায়নি বলে জানা গেছে।
অল্প কিছু বিদ্যালয়ে পেলেও যথাসময়ে পায়নি। তাও আবার দুটি খাবারের মধ্যে কোন বিদ্যালয় পেয়েছে একটি খাবার। কোনও বিদ্যালয় পেয়েছে দুটি খাবার। এর মধ্যে ১০ শতাংশ কম পেয়েছে। খাবারের তালিকায় ছিল বনরুটি আর ডিম। এর মধ্যে বনরুটির উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ সুস্পষ্ট লেখা নেই। এসব স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার কোন ঠিকাদার, কে বা কারা বিতরণ করছে কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছেনা।
আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রোমানা আক্তার খানম বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে ৩৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও জন্য খাবার পাঠিয়েছে ৩০২ জনের জন্য। দুটি বন রুটি ও একটি ডিম দিয়েছে। বাকি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, ২৫ সালের তালিকা অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয়েছে।’
আনোয়ারা সরস্বতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অরুন কুমার গুপ্ত বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত খাবার দিতে পারেনি স্বদেশ পল্লীর নিয়োজিত কর্মীরা। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে বাড়িতে চলে গেছে। নিয়োজিত ঠিকাদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সুফল মিলেনি। প্রথমদিনে হতাশ শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা।’
সরস্বতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাহমিন ইসলাম বলে, ‘আমরা সকাল থেকে অধীর আগ্রহে ছিলাম, আজ খাবার পাব। এখন স্কুল ছুটির সময় হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত খাবার আসেনি।’
এনজিও সংস্থা স্বদেশ পল্লীর কো-অর্ডিনেটর নাহিদুল আলম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ছিলো আগের দিনই প্রতিটি স্কুলে খাবার পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু শিক্ষা অফিস বা স্কুলের শিক্ষকরা কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, স্কুলে দুই ঘন্টার মধ্যে খাবার পৌঁছানোর। কিন্তু প্রথমদিন সড়কে যানজটের কারণে একটু সমস্যা হয়েছে। আগামীকাল থেকে এমনটা হবে বলে আশা করছি।’
আনোয়ারা উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. হিন্দোল বারী গণমাধ্যমেকে বলেন, সরকারি ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহযোগিতায় আনোয়ারার ১১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’ শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কলা, ভন, সিদ্ধ ডিম, ইউএইচটি মিল্ক, ৪৫ বিস্কুট দেয়া হবে। প্রথমদিনে প্রায় ৪০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খাবার পাননি। স্বদেশ পল্লী এবং নিয়োজিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও কোনো সুফল মেলেনি।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আমরা লিখিতভাবে মন্ত্রণালয় এবং বোর্ডকে জানিয়েছি তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকরা অভিযোগ করে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে, স্কুলে ঝরে পড়া রোধ এবং উপস্থিতি বাড়াতে এই কর্মসূচি হাতে নিলেও দায়িত্বহীন এনজিও সংস্থা ও ঠিকাদারদের কারণে আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তারা।