Image description

বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিধ্বংসী ও সংক্রামক ব্যাধির নাম ভাইরাল হওয়ার উন্মাদনা। এই উন্মাদনা কেবল সাময়িক শখ নয়, বরং এটি একটি আধুনিক মানসিক দাসত্ব। ফেসবুকের রিয়েকশন, ইউটিউবের ওয়াচ-টাইম আর টিকটকের ফলোয়ারের সংখ্যার গাণিতিক হিসাবে এখন মানুষের ওজন দেখা হয়। সম্মান এখন আর নৈতিকতা বা চরিত্রের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা সস্তা জনপ্রিয়তার পাল্লায় দুলছে। আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি এখন নিজের ভেতরের শক্তি নয়, বরং স্ক্রিনে থাকা অপরিচিত মানুষদের মরীচিকাতুল্য ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ হলো এর চালিকাশক্তি।

অথচ আজ থেকে ১৪শ বছর আগে, আরবের তপ্ত ধূসর মরু প্রান্তরে দাঁড়িয়ে মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের শিখিয়েছিলেন এক অনন্য জীবনদর্শন। যেখানে খ্যাতি নয়, বরং খোদাভীতি, পরিচিতির বদলে ইখলাস এবং মানুষের বাহবার পরিবর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল সফলতার প্রকৃত মানদণ্ড। সেই জীবনদর্শনে ‘ভাইরাল’ না হওয়া কোনো অভাব নয়, বরং বিরাট নেয়ামত। মানুষের চোখে অচেনা থাকা ব্যর্থতা নয়, বরং আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার অনন্য পথ।

হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন বান্দাকে ভালোবাসেন, যে তাকওয়াবান হয় (আল্লাহকে ভয় করে) এবং (হৃদয়ের দিক থেকে) ধনী ও প্রচারবিমুখ হয়।’ (সহিহ মুসলিম)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, দ্বীন অথবা দুনিয়ার কোনো বিষয়ে মানুষ তার দিকে (খ্যাতির কারণে) আঙুল তুলে ইশারা করবে। তবে যাকে মহান আল্লাহ রক্ষা করেন, তার কথা ভিন্ন।’ (সুনানে তিরমিজি)

সহিহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে প্রজ্বলিত করা হবে। তাদের একজন শহীদ, একজন আলেম এবং একজন দানবীর। তাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হবে, তারা আমলগুলো করেছিল যাতে মানুষ তাদের বীর, বিদ্বান বা দাতা বলে প্রশংসা করে। মহান আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে বলবেন, তুমি যা চেয়েছিলে (দুনিয়ার খ্যাতি), তা তো তুমি পেয়েই গেছ। (তাই এখন জাহান্নামে যাও)। (সহিহ মুসলিম)

সহিহ বুখারির একটি হাদিস আজ আমাদের সমাজের আয়না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ধ্বংস হোক দিনার ও দিরহামের গোলাম, উত্তম পোশাক ও উত্তম চাদরের গোলাম! যদি তাকে (এগুলো) দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। (সহিহ বুখারি)

মানুষ আজ প্রশংসা ও সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য নিজের গোপনীয়তা, এমনকি আত্মসম্মান পর্যন্ত বিসর্জন দিচ্ছে। আর একটু ভিউ বা কমেন্ট কম পড়লে হতাশায় ডুবে যায়। হাদিসে যে দিকটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা হুবহু আজকের ভাইরাল কালচারে বিদ্যমান। কারণ সে এমন ব্যক্তি, যদি কিছু পায় তবেই সন্তুষ্ট থাকে, আর না পেলে অসন্তুষ্ট হয়।

আমাদের চারপাশে এখন নেতৃত্বের লালসা আর বড় পদে আসীন হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলমান। সবাই চায় ফ্রন্টলাইন বা সামনের কাতারে থাকতে। অথচ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে ঘোড়ার লাগাম ধরে জিহাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, যার মাথার চুল এলোমেলো এবং পা ধূলিধূসরিত। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে পাহারায় থাকে আর (সৈন্য দলের) পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে। সে কারো সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয় না এবং কোনো বিষয়ে সে সুপারিশ করলে তার সুপারিশও গ্রহণ করা হয় না। (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস আমাদের সামনে চমৎকার শিক্ষা তুলে ধরে, যে সামনে থাকার জন্য ব্যাকুল নয়, যার চোখ পদ-পদবিতে আটকা নয়, যার অন্তর মানুষের স্বীকৃতিতে নয়, বরং সে সন্তুষ্ট শুধু এই বিষয়ে যে, মহান আল্লাহ যেখানে রাখবেন, সেখানেই সে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। সামনে রাখা হলে সামনে, পেছনে রাখা হলে পেছনে, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো হতাশা নেই, কোনো দাবি নেই।

আজকের প্রদর্শনীবাদ সমাজে এই চরিত্র অচেনা। অথচ হাদিস বলছে, মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা সেই, যে লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও নিজের দায়িত্বকে ইবাদতে পরিণত করে। মানুষের চোখে সে অপরিচিত হতে পারে, মানুষের কাছে তার কোনো প্রসিদ্ধি না থাকতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহর দরবারে সে অসীম মর্যাদার অধিকারী।

হজরত সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ঘটনা ক্ষমতার মোহে অন্ধ এ যুগের মানুষের জন্য বড় শিক্ষা। যখন মানুষ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল, তিনি তখন উটের পাল নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে জীবন অতিবাহিত করছিলেন। তার পুত্র যখন তাকে ক্ষমতায় শরিক হওয়ার আহ্বান জানাল, তিনি তখন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সেই অমিয় বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই বান্দাকে ভালোবাসেন, যে তাকওয়াবান, আত্মনির্ভরশীল এবং মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। (সহিহ মুসলিম)

দান-সদকা থেকে শুরু করে প্রায় সব ইবাদত এখন ক্যামেরাবন্দি। রিয়া বা লোক দেখানো মানসিকতা আমাদের আমলগুলোকে ছাই করে দিচ্ছে। ইসলামের শিক্ষা হলো, আপনার ডান হাত দান করলে বাম হাতও যেন তা টের না পায়। কিন্তু বর্তমানের লোক দেখানো সংস্কৃতি আমাদের ভেতর থেকে ইখলাস কেড়ে নিয়েছে। ভাইরালবাদের ক্ষতিসমূহ উল্লেখ করা হলো।

ইখলাস ও আমলের বিশুদ্ধতার বিলুপ্তি : ভাইরাল হওয়ার নেশায় আমাদের প্রতিটি কাজ এখন আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে মানুষের প্রশংসার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ইসলামে একে বলা হয় রিয়া বা লোক দেখানো আমল, যা একটি ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক। তাই আমলগুলোর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ওপর যে জিনিসটির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।’ (মুসনাদে আহমাদ)

আত্মিক প্রশান্তি নষ্ট : ভাইরাল মানসিকতার মানুষ সবসময় অন্যের রিয়েকশনের ওপর নির্ভর করে। লাইক বা ভিউ কম হলে সে হতাশায় ভোগে, আর বেশি হলে অহংকারী হয়ে ওঠে। এর ফলে তার ভেতরের প্রশান্তি নষ্ট হয়ে যায়।

গিবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতার প্রসার : ভাইরাল হওয়ার জন্য মানুষ এখন নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করছে না। অদ্ভুত কন্টেন্ট বানানো, অন্যকে নিয়ে ট্রল করা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ফাঁস করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এর মাধ্যমে সমাজে ওরা বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সময়ের অপচয় : একজন মানুষ ভাইরাল হওয়ার চিন্তায় নিজের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, ইবাদতসহ সবকিছুর চেয়ে স্ক্রিন টাইমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে উম্মাহর মূল্যবান জনশক্তি সৃজনশীল কাজ বাদ দিয়ে সস্তা বিনোদনে সময় নষ্ট করছে। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের একটি দিক হলো, তার অনর্থক কাজ ত্যাগ করা।’ (সুনানে তিরমিজি)

গোপনীয়তার বিলুপ্তি : ভাইরাল কালচার মানুষকে শিখিয়েছে সবকিছু প্রকাশ করে দিতে। এমনকি নিজের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোও ভিউয়ের জন্য বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ লজ্জা হলো ইমানের অন্যতম অঙ্গ, যা আজ হুমকির মুখে।

বর্তমান সময়ের এই ভাইরাল হওয়ার উন্মাদনা আসলে একটি মরীচিকা মাত্র, যা মানুষকে সাময়িক তৃপ্তি দিলেও আত্মাকে করে তোলে রিক্ত ও নিঃস্ব। আমরা এমন এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের হাতের লাইক আর রিয়েকশন আমাদের ইমানের ওপর প্রভাব ফেলেছে। অথচ মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে নিজের রবের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা।

লেখক : মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদমুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা