বর্তমান সময়ে ভাইরাল হওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়েছে। চলচ্চিত্রজগৎও এর বাইরে নয়। পরীমনিও নন।
অভিনেতা-অভিনেত্রীরা শোবিজের মানুষ। প্রচার, পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও আলোচনায় থাকা তাদের পেশারই একটি অংশ। তারা আলোচনায় থাকতে চাইবেন, জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম কী?
একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অভিনয়। তার সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিভা। একটি চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের চোখে জল এনে দেওয়া, হাসানো কিংবা গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করাই একজন শিল্পীর প্রকৃত সার্থকতা। সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যখন চরিত্রটি দর্শকের মনে বেঁচে থাকে, তখনই একজন অভিনেতা সফল হন।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের চলচ্চিত্রজগতের অনেক তারকার ক্ষেত্রে অভিনয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন, বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বছরজুড়ে তাদের নিয়ে আলোচনা চলছে, বিতর্ক হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম থাকছে। অথচ দর্শকের মনে দাগ কাটার মতো কাজের সংখ্যা কতটুকু? একজন শিল্পী যদি তার অভিনয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত বিতর্কের কারণে বেশি পরিচিত হন, তাহলে সেটি আত্মসমালোচনার বিষয়। এখানে সাংবাদিকদের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দেশে কত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে! রাজনীতি, অর্থনীতি, দুর্নীতি, অপরাধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমিকের অধিকার ও সাধারণ মানুষের বঞ্চনা কত বিষয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অপেক্ষায় রয়েছে। কত মানুষের অজানা কষ্ট, কত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় পড়ে আছে।
কিন্তু সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ অনেক সময় এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাশ কাটিয়ে তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, কে কাকে কী বললেন, কে কার সঙ্গে কোথায় গেলেন কিংবা কে কাকে অপমান করলেন এসব নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটাই কি সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব?
সাংবাদিকতা কি কেবল ভাইরাল হওয়ার উপকরণ? নাকি সমাজের অসংগতি তুলে ধরা, সত্য প্রকাশ করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা?
মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যম শুধু মানুষের আগ্রহের পেছনে ছুটবে না; মানুষের রুচি, চিন্তা ও সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে। পাঠককে কী পড়ানো হচ্ছে, দর্শককে কী দেখানো হচ্ছে, সেটিও গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
শিল্পী তার কাজ ভুলে গেলে শিল্পের ক্ষতি হয়, আর সাংবাদিক তার দায়িত্ব ভুলে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। আমি চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষ। সত্যি বলতে, পরীমনিকে নিয়ে আমারও একসময় অনেক প্রত্যাশা ছিল। তার অভিনয়জীবন নিয়ে সম্ভাবনার কথা ভেবেছি।
আমি চেয়েছিলাম, মেয়েটি একদিন সত্যিকারের বড় অভিনেত্রী হয়ে উঠবেন। তার অভিনয় নিয়ে আলোচনা হবে, তার সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হবে। তিনি নিজের প্রতিভা ও যোগ্যতা দিয়ে চলচ্চিত্রজগতে পরিচিতি পাবেন।
আমি ভেবেছিলাম, তিনি নিজের দুই ডানায় ভর করে উড়বেন। দর্শক তাকে মনে রাখবেন তার অভিনয়ের জন্য, তার চলচ্চিত্রের জন্য, তার চরিত্রগুলোর জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রত্যাশার জায়গায় তৈরি হয়েছে হতাশা।
জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, ভাইরাল হওয়া কয়েক দিনের ব্যাপার। কিন্তু শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় তার সৃষ্টিকর্ম। বিতর্ক দিয়ে সাময়িক আলোচনায় থাকা যায়, কিন্তু দীর্ঘদিন দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে হলে প্রতিভা, পরিশ্রম ও ভালো কাজের বিকল্প নেই।
শিল্পীর পরিচয় তার শিল্পে, বিতর্কে নয়। সাংবাদিকের পরিচয় তার সত্য প্রকাশে, ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নয়। কিন্তু হায়! এই পরী যে নকল ডানার পরী, কেইবা জানত!