পুরো পৃথিবী এখন ফুটবল বিশ্বকাপের আনন্দে মেতে আছে, আর বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরাও এতে পিছিয়ে নেই। ফুটবল বিশ্বকাপের কথা আসলেই মাঠের খেলার পাশাপাশি যার গান আর সুন্দরের কথা সবার মনে পড়ে, তিনি হলেন পপ স্টার শাকিরা।
‘ওয়াকা ওয়াকা’ বা ‘লা লা লা’ গানের মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকাপের সাথে মিশে যাওয়া এই কলম্বিয়ান তারকাকে নিয়ে এখন অনেক আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে তার নতুন গান ‘দাই দাই’ তো বেশ জনপ্রিয় এখন। তবে অনেকেই জানেন না যে, বিশ্ব কাঁপানো এই গায়িকা একসময় সবার অলক্ষ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। শুধু আসেনইনি, ২০০৭ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-এ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট দেখে তিনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাকিরার বাংলাদেশ সফরের একটি পুরনো ছবি নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি সাধারণ ক্লাসরুমে মাটির মাদুরে বসে একঝাঁক শিশুর সাথে হাসিমুখে হাততালি দিচ্ছেন এই গ্লোবাল সুপারস্টার।
চলুন জেনে নেওয়া যাক পপ কুইন শাকিরার সেই ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সফরের নেপথ্যের গল্প।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। এর ঠিক এক মাস পর, ১৭ ডিসেম্বর ইউনিসেফের গ্লোবাল গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ৩ দিনের আকস্মিক সফরে ঢাকায় আসেন শাকিরা। বিলাসবহুল জীবন পেছনে ফেলে তিনি ছুটে যান দুর্যোগকবলিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
ভাইরাল হওয়া ছবিটি মূলত পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ অথবা রাজশাহীর একটি ইউনিসেফ পরিচালিত শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের। সিডরে ঘরবাড়ি ও স্কুল হারানো শিশুদের মানসিক ট্রমা কাটাতে ইউনিসেফ তখন বিশেষ অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করেছিল। শাকিরা সেখানে কোনো প্রটোকল ছাড়াই সাধারণ শিশুদের মাঝে মেঝেতে বসে পড়েন।
স্থানীয় শিশুরা যখন তাদের চিরচেনা গ্রামীণ ছড়া ও গান গেয়ে শাকিরাকে স্বাগত জানাচ্ছিল, তখন তিনি মুগ্ধ হয়ে হাততালি দিয়ে তাদের সাথে সুর মেলান। ছবির সেই চওড়া হাসিটি ছিল দুর্যোগের মাঝেও শিশুদের মুখে আনন্দ ফিরিয়ে আনার এক অনন্য মুহূর্ত।
সফরের দ্বিতীয় দিনে শাকিরা হেলিকপ্টারে করে পটুয়াখালীর সিডর বিধ্বস্ত এলাকায় যান। সেখানকার ধ্বংসযজ্ঞ এবং শিশুদের করুণ অবস্থা দেখে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন এবং শিশুদের বুকে টেনে নেন।
বাংলাদেশ সফর শেষ করে ফিরে গিয়ে শাকিরা বিশ্ববাসীর কাছে সিডর আক্রান্ত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর তীব্র আকুতি জানান। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আমি বাংলাদেশে এমন শিশুদের দেখেছি যারা সব হারিয়েও হাসতে চেনে। কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার জন্য এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের জরুরি সাহায্য প্রয়োজন।’ তার এই সফরের পর বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের সিডর দুর্গতদের জন্য বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগৃহীত হয়েছিল।
২০০৭ সালের সেই সফরের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও, এই ছবিটি আজও প্রমাণ করে—তারকার খোলস ছেড়ে শাকিরা সেদিন এক জনদরদী মানুষ হিসেবেই বাংলাদেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।