ইতিহাসে কত আন্দোলনই তো হলো। ফি কমানোর আন্দোলন, হল খোলার আন্দোলন, এমনকি ডাল-ভাতে মাছের টুকরা বড় করার আন্দোলন। কিন্তু গতকাল থেকে ঢাবি এলাকায় যে অভাবনীয় ‘ছাত্রী-অসন্তোষ’ তৈরি হয়েছে, তার কোনো নজির গত ১০০ বছরে পাওয়া যাবে না।
ঘটনার সূত্রপাত ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের শুভ পরিণয়। খবরটি চাউর হওয়ার পর থেকেে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক ক্যান্টিনে আজ সকালে ‘স্যুপ’ ছাড়া কিছুই রান্না হয়নি, কারণ রাঁধুনিরা জানিয়েছেন—ছাত্রীরা কান্নাকাটি করে চোখের পানিতে ফ্লোর ভাসিয়ে ফেলেছে, হাঁড়ি বসানোর জায়গা নেই।
‘বিয়ে বাতিলের দাবিতে’ স্মারকলিপি
দুপুরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জড়ো হয়েছিলেন শত শত ‘মনে মনে পছন্দ করা’ ছাত্রী। তাদের দাবি একটাই—“এই বিয়ে মানি না, মানব না! অবিলম্বে এই অগণতান্ত্রিক বিবাহ বাতিল করতে হবে।”
আন্দোলনের নেত্রী (যিনি নিজের ফেসবুক বায়োতে লিখে রেখেছেন ‘Waiting for someone special’) অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ভিপি নির্বাচনে আমরা তাকে ভোট দিয়েছিলাম এই আশায় যে তিনি আমাদের অধিকার রক্ষা করবেন। কিন্তু তিনি কি একবারও ভেবেছেন, তার এই হটকারী সিদ্ধান্তে কত হাজার হাজার ছাত্রীর ‘সিঙ্গেল’ স্ট্যাটাস আজ হুমকির মুখে? এটা কি রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা নয়?”
ছাত্রীদের অকাট্য যুক্তি: কেন তারাই উপযুক্ত?
আন্দোলনরত ছাত্রীরা তাদের দাবির সপক্ষে এমন কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন যা শুনলে প্লেটো বা অ্যারিস্টটলও পুনরায় শিক্ষা নিতে আসতেন। তাদের কিছু প্রধান যুক্তি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ভোটাধিকার বনাম বিবাহাধিকার:
আন্দোলনকারী ছাত্রীদের দাবি, ‘আমরা তাকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছি। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী, তার জীবনের যে কোনো বড় সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে বিয়ে, গণভোটের (Referendum) মাধ্যমে হওয়া উচিত ছিল। তিনি আমাদের মতামত না নিয়ে বিয়ে করে স্পষ্টত নির্বাচনি ইশতেহার লঙ্ঘন করেছেন। তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও এখন অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
২. ‘আমরাই তো তাকে বেশি চিনি’:
এক ছাত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সাদিক ভাই যখন মিছিলে ঘামতেন, তখন আমরা স্ক্রিনশট নিয়ে সেই ঘাম মুছে দেওয়ার কল্পনা করতাম। যে মানুষটা আমাদের কল্পনায় প্রতিদিন সকালের নাশতা করত, সে বাস্তব জীবনে অন্য কারও সাথে ডিনার করবে—এটা তো এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট লঙ্ঘন!”
৩. সিজিপিএ এবং ঘরসংসার:
আরেক হলের ছাত্রীর যুক্তি আরও জোরালো, ‘আমি অনার্সে ৩ দশমিক ৮৫ পেয়েছি। সাদিক ভাইও মেধাবী। দুই মেধাবীর মিলন হলে দেশের জিডিপি বাড়ত। এখন তিনি যাকে বিয়ে করেছেন, তার সিজিপিএ কি যাচাই করা হয়েছে?
‘সাদিক কায়েমকে ছিনতাইয়ের সঙ্গে তুলনা’
বিক্ষোভ সমাবেশে বারবার একটি শব্দ উচ্চারিত হচ্ছিল—‘ছিনতাই’। ছাত্রীদের অভিযোগ, সাদিক কায়েম কোনো সাধারণ পুরুষ নন; তিনি একটি ‘পাবলিক কমোডিটি’ বা সরকারি সম্পত্তি। আর সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত কব্জায় নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
এক ছাত্রী ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, “আমরা বছরের পর বছর ধরে তাকে ফেসবুকে লালন-পালন করলাম। লাইক দিলাম, লাভ রিঅ্যাক্ট দিলাম, দূর থেকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আর হুট করে একজন এসে তাকে তুলে নিয়ে যাবে? এটা তো স্ট্রেট ফরওয়ার্ড ডিজিটাল এবং ইমোশনাল ছিনতাই!
বিশেষজ্ঞ মহলের প্রতিক্রিয়া
এই অদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় জটিলতা সেল’ একটি জরুরি মিটিং ডেকেছে। জনৈক সমাজবিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন, “আসলে সাদিক কায়েমের প্রতি ছাত্রীদের এই মোহ ছিল একটি ‘কালেক্টিভ ইলিউশন’। সবাই ভেবেছিল সাদিক ভাই সবার। এখন তিনি যখন একজনের হয়ে গেছেন, তখন বাকিদের কাছে মনে হচ্ছে তাদের শেয়ার বাজার ধসে পড়েছে।”
তবে ছাত্রীরা দমবার পাত্র নয়। তারা এখন ‘সাদিক কায়েম পুনর্বাসন কমিটি’ গঠনের কথা ভাবছেন। তাদের পরবর্তী কর্মসূচিগুলো হলো:
সাদিক কায়েমের বাড়ির সামনে ‘মৌন অনশন’।
ফেসবুকে নববধূর প্রোফাইল পিকচারে ‘অ্যাংরি’ রিঅ্যাক্ট দেওয়ার জন্য বিশেষ সেল গঠন।
বিয়ে বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল।
একটি করুণ আর্তনাদ
বিক্ষোভের একদম শেষ পর্যায়ে এক ছাত্রীকে দেখা গেল একটি ব্যানার ধরে একা বসে আছেন। ব্যানারে লেখা—“সাদিক ভাই, আপনি না হয় বিয়ে করলেনই, কিন্তু আমাদের যে স্বপ্নগুলোর এখন রি-টেক পরীক্ষা দিতে হবে, তার ফি কে দেবে?”
আসলে রাজনীতিতে হার-জিত থাকে, কিন্তু ভালোবাসার রাজনীতি বড়ই নিষ্ঠুর। সাদিক কায়েম হয়তো এখন শশুর বাড়িতে মিষ্টি খাচ্ছেন, কিন্তু ক্যাম্পাস এলাকায় এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাসের বাতাস। তারা এখনো বিশ্বাস করেন, ভালোবাসা আসলে অন্ধ নয়, বরং ভালোবাসা হলো ‘সাদিক কায়েমের সিঙ্গেল থাকা’।
অবশেষে আন্দোলনকারীরা আলটিমেটাম দিয়েছেন—আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি এই বিয়ে ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণা করা না হয়, তবে তারা সবাই মিলে ক্যাম্পাসে ‘দেবদাস’ সিনেমাটি প্রজেক্টরে চালিয়ে গণ-কান্না কর্মসূচি পালন করবেন।
সাদিক কায়েমের নববধূ কি পারবেন এই হাজার হাজার ‘মনে মনে প্রেমিকা’র অভিশাপ থেকে নিজের সংসার বাঁচাতে? নাকি ঢাবির ছাত্রীরাই নতুন কোনো আইন পাস করে এই বিয়ে বাতিল করে ছাড়বে? উত্তর তোলা থাকল সময়ের হাতে। আপাতত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাতাস ভারী হয়ে আছে প্রিয় পুরুষের বিয়েজনিত ‘বিয়োগ’ ব্যথায়।