গভীর রাত। পুরান ঢাকার সরু গলিগুলো তখন নিস্তব্ধ। অথচ যার পরতে পরতে রয়েছে ঐতিহ্যের বিনুনি। রমজান পালনেও তাদের রয়েছে আলাদা লোকাচার। এক সময়ের রমজানের রাতে বুড়িগঙ্গার পানির ওপর দিয়ে অন্ধকারে ভেসে আসত সুরেলা কণ্ঠ। দূর থেকে শোনা যেতো সম্মিলিত কণ্ঠের আহ্বান ‘ওঠো মোমিন, ওঠো রোজাদার, সেহরির সময় হয়েছে।’ হারমোনিয়ামের সুর, ঢোলের মৃদু তাল আর মানুষের কণ্ঠ মিলিয়ে গভীর রাতের পুরান ঢাকার সরু গলিগুলো যেন এক অন্য জগতে পরিণত হতো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নারী ও শিশুরা অপেক্ষা করত, কখন কাসিদার দল তাদের মহল্লার সামনে এসে পৌঁছাবে। কিন্তু এই দৃশ্যপট এখন শুধুই সুখস্মৃতি আর ঐতিহ্য।
সেহরির সময়ে কাসিদা গাওয়ার দৃশ্য আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা। কিন্তু পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের কাছে এটি ছিল রমজানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানের মতো ছিল না মোবাইল ফোন কিংবা অ্যালার্ম ঘড়ি। একসময় সেহরির সময় মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য রাতের শেষ প্রহরে কাসিদা দলই ছিল একমাত্র ভরসা। কাসিদা দল যে সংগীত গেয়ে মানুষকে সেহরির জন্য ডাকতো সেটিই ছিল ‘কাসিদা’। ধর্মীয় কবিতা, সংগীত এবং সামাজিক মিলনের এক অনন্য ঐতিহ্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই সুর আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও নগর জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে পুরান ঢাকার এই শতবর্ষী সংস্কৃতি।
ভক্তিমূলক কবিতা থেকে কাসিদা সংগীত
‘কাসিদা’ শব্দটির উৎস আরবি ভাষা। আরবি ‘ক্বাসাদ’ শব্দের অর্থ প্রশংসা বা উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য। পরে এটি ফারসি ভাষায় ‘কাসিদা’ নামে পরিচিত হয়। মূলত এটি একটি স্তুতিমূলক কবিতা, যেখানে আল্লাহর মহিমা, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা, কিয়ামত ও আখিরাতের ভাবনা এবং ইসলামের নৈতিক শিক্ষা তুলে ধরা হয়। রমজান মাসে এসব কবিতা সুর করে গাওয়া হতো। ফলে কাসিদা ধীরে ধীরে শুধু সাহিত্য নয়, একটি আবহ সংগীতধারায় পরিণত হয়। ‘ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ক্বাসীদা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, দশম শতাব্দীতে পারস্যে কাসিদার বিকাশ ঘটে। সুলতান মাহমুদ গজনির দরবারে অসংখ্য কবি এই ধরনের কবিতা রচনা করতেন। ফারোখি, আনভারি, নাসির খসরুর মতো কবিরা কাসিদা রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এসব কাব্যে ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি নৈতিকতা, দর্শন এবং সামাজিক বার্তা উঠে আসত। পারস্য থেকে এই সাহিত্যধারা ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে মুঘল আমলে। সে সময় ফার্সি ছিল মুঘলদের প্রশাসনিক ভাষা। ফলে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও কাসিদার প্রভাব দেখা যায়। পূর্ববঙ্গে কাসিদার প্রাচীনতম তথ্যটি পাওয়া যায় মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’ গ্রন্থে।
পুরান ঢাকার গলিতে ভেসে উঠবে সেই চিরচেনা আহ্বান- ‘ওঠো মমিন, ওঠো রোজাদার… সেহরির সময় হয়েছে।’
সেই সুর যদি আবার ফিরে আসে, তবে তা শুধু একটি সংগীতের প্রত্যাবর্তন হবে না; সেটি হবে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ।
তিনি ছিলেন একজন মোগল সেনাপতি। ১৬০৮ সালে ইসলাম খান চিশতির সঙ্গে মোগল নৌবহরের সেনাপতি হিসেবে বঙ্গে এসেছিলেন নাথান। এক সামরিক অভিযানে গিয়েছিলেন যশোরে। তাঁর সেই যশোরের আস্তানায় সে সময় এক বিশাল আনন্দোৎসবের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কবিরা নিজেদের লেখা কবিতা বা কাসিদা পরিবেশন করেন। সবার অনুরোধে যশোরের আবহাওয়া নিয়ে স্বরচিত কাসিদা আবৃত্তি করেন কবি আগাহি। ঢাকায় কাসিদা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার হারিয়ে যাওয়া ঢাকায় উল্লেখ করেছেন, মুঘল যুগ থেকেই কাসিদার প্রচলন শুরু। পরে ব্রিটিশ আমলে এর চর্চা কিছুটা কমে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, ইসলামী সাহিত্য ও সুফি সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে কাসিদা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলার দরবারি সংস্কৃতি, সুফি দরগাহ এবং মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে কাসিদা ধীরে ধীরে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবার নতুন করে কাসিদার পুনর্জাগরণ ঘটে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকায় আগত উর্দুভাষী মোহাজেরদের (দেশে বা নগরে নতুন আগন্তক) মাধ্যমে কাসিদা নতুন মাত্রা পায়। জানা যায়, পুরান ঢাকায় তখন কাসিদা গাওয়ার দুটি প্রধান ধারা ছিল। একটি ছিল ‘সুব্বাসি’ বা ‘সুখবাসী’ দল, যারা মূলত উর্দু ও ফার্সি ভাষায় কাসিদা গাইত। অন্যটি ছিল ‘কুট্টি’ দল, যারা বাংলা, উর্দু ও হিন্দি ভাষা মিশিয়ে কাসিদা পরিবেশন করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কবিতা শুধু সাহিত্যিক ধারায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সংগীতের রূপও লাভ করে। বিশেষ করে রমজান মাসে এসব কবিতা সুর করে গাওয়া হতো। ফলে কাসিদা হয়ে ওঠে ধর্মীয় আবেগ, কবিতা ও সংগীতের এক অনন্য মেলবন্ধন।
এটি ছিল পুরান ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরান ঢাকার সেহরির অন্যতম অনুসঙ্গ
একসময় রমজান মাস এলেই পুরান ঢাকার মহল্লাগুলো কাসিদার সুরে মুখর হয়ে উঠত। রমজান শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হতো মহড়া। রাতের শেষ প্রহরে তরুণরা হারমোনিয়াম কাঁধে ঝুলিয়ে, টিনের ঢোল, ডুগডুগি এবং লণ্ঠন হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত গলির পথে। তারা সমবেত কণ্ঠে কাসিদা গাইত এবং ঘুমন্ত মানুষদের সেহরির জন্য জাগিয়ে তুলত। এই আয়োজন শুধু সংগীত পরিবেশনা ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। অনেক পরিবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাসিদা শুনত। কেউ কেউ মিষ্টি বা খাবার দিয়ে কাসিদা দলের সদস্যদের আপ্যায়ন করত। রমজান শুরু হলে মহল্লাভিত্তিক কাসিদা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। নবাব পরিবার বা এলাকার ধনী ব্যক্তিরা এসব প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। যা এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নানা সময়ে দায়িত্ব পালন করেন।
‘ঢাকায় আনন্দ উৎসব’ গ্রন্থে লেখক রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন, কাসিদার সুরে বিভিন্ন রাগের প্রভাব দেখা যায়। যেমন: শাহেদি, মার্সিয়া, নাত-এ রাসুল, ভৈরবী ও মালকোষ। অনেক সময় সমসাময়িক চলচ্চিত্রের সুর থেকেও অনুপ্রেরণা নেওয়া হতো। সাধারণত কাসিদা সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হতো। যে ব্যক্তি দল পরিচালনা করতেন তাকে বলা হতো ‘সালারে কাফেলা’। লেখক আরো উল্লেখ করেছেন, উপমহাদেশে বহু কবি কাসিদা রচনায় খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে মুনসেফ, এজাজ, হামিদ-এ-জার, হাফেজ দেহলভি, জামাল মাশরেকি, তালেব কবির, মুজিব আশরাফি, সারওয়ার ও শওকতের নাম উল্লেখযোগ্য।
বিলুপ্তির পথে ঢাকার কাসিদা
একসময় পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি মহল্লায় কাসিদা দল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। প্রযুক্তির অগ্রগতি এর অন্যতম কারণ। মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম, ঘড়ির অ্যালার্ম এবং মসজিদের মাইকে সেহরির ঘোষণা মানুষের ঘুম ভাঙানোর কাজ সহজ করে দিয়েছে। ফলে কাসিদা দলের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। এর পাশাপাশি নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং ফার্সি-উর্দু ভাষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াও কাসিদার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। তবে এখনো নিভু নিভু আলোর মতো, পুরান ঢাকার গুটি কয়েক এলাকায় কাসিদা গাওয়ার ঐতিহ্য টিকে আছে। বংশাল, লালবাগ, নাজিরাবাজার ও হোসেনি দালান এলাকায় কিছু দল এখনও রমজানে কাসিদা পরিবেশন করে।
এই বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য রক্ষায় কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন কাজ করছে। ‘ঢাকাবাসী’ নামে একটি সংগঠন নিয়মিত কাসিদা উৎসব ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে কাসিদার সঙ্গে পরিচিত করতে সাহায্য করছে। অনেক গবেষক মনে করেন, সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দিলে এই ঐতিহ্য আবারও নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
চলচ্চিত্রে কাসিদার গল্প
ঢাকার হারিয়ে যাওয়া এই সংগীত ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য নির্মিত হয়েছে একটি প্রামাণ্যচিত্র ‘কাসিদা অব ঢাকা’। প্রামাণ্যচিত্রটি ২০২০ সালে ভারতের দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ইন্দুস ভ্যালি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতে নেয়। পরিচালক অনার্য মুর্শিদের নির্মিত এই ২০ মিনিটের চলচ্চিত্রে কাসিদার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান সংকট তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করেছে। ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্দুস ভ্যালি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটি সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার লাভ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত, জার্মানি ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে এটি প্রদর্শিত হয়েছে।
স্মৃতিতে বেঁচে থাকা এক ঐতিহ্য
পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারা এখনও স্মৃতিচারণ করেন সেই দিনগুলোর কথা, যখন রমজানের রাত মানেই ছিল কাসিদার সুর। লণ্ঠনের আলোয় তরুণদের দল গলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াত। গভীর রাতে ঘুম ভাঙত মানুষের কিন্তু সেই ঘুম ভাঙানো ছিল আনন্দের, ছিল উৎসবের। আজ সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। তবু ইতিহাসের পাতায়, প্রবীণদের স্মৃতিতে এবং কয়েকজন নিবেদিত শিল্পীর কণ্ঠে এখনও টিকে আছে কাসিদা। হয়তো কোনো একদিন আবারও পুরান ঢাকার গলিতে ভেসে উঠবে সেই চিরচেনা আহ্বান-
‘ওঠো মমিন, ওঠো রোজাদার… সেহরির সময় হয়েছে।’
সেই সুর যদি আবার ফিরে আসে, তবে তা শুধু একটি সংগীতের প্রত্যাবর্তন হবে না; সেটি হবে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ।
লেখক: জাহিদুল ইসলাম, শিক্ষক, বাংলাদেশ স্টাডিজ এন্ড জিওগ্রাফি
মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ঢাকা।