পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে চলা অস্থিরতা, সহিংসতা ও নৈরাজ্যের ঘটনায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তদন্তে নেমে শতাধিক কারখানার একটি তালিকা তৈরি করেছে গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন। পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
টানা কয়েক দিন ধরে পোশাকশিল্পাঞ্চলে চলা অস্থিরতা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছিল। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কারখানার মালিক ও শ্রমিকেরা।
কয়েকজন গার্মেন্টসকর্মী জানান, তাঁদের কারখানার কোনো শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেননি। তাঁদের দাবি, আন্দোলনকারীরা ছিলেন বাইরের লোক। কারখানার ক্ষতি হলে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদেরই জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তাই বাইরের কোনো পক্ষের হামলা বা আক্রমণের আশঙ্কায় তাঁরা ভীত ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিকদের কোনো সমস্যা ছিল না।
এ বিষয়ে স্টাইলিশ গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, নতুন করে চাপ সৃষ্টি হলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গত দুই বছরেই পোশাকশিল্পে অনেক প্রতিষ্ঠান কমে গেছে। এতে বহু শ্রমিক বেকার হয়েছেন এবং কারখানার আশপাশের দোকানপাটও বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, পোশাকশিল্প শুধু মালিকদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শ্রমিক এবং আশপাশের এলাকার মানুষের জীবিকাও জড়িত।
অস্থিরতার ঘটনায় বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে নামে গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন। তদন্তসংশ্লিষ্ট তালিকায় শতাধিক আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কারখানার নাম উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে রেনেসা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে সেপাল গ্রুপের চারটি কারখানার। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান বাদলের সঙ্গে তুষকা গ্রুপের কারখানার সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে।
তালিকায় আরও রয়েছে আওয়ামী লীগের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে স্টারলিং গ্রুপের সম্পৃক্ততার তথ্য। পাশাপাশি ইসলাম গ্রুপের মালিক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমানের নামও রয়েছে।
পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে একটি পক্ষ সক্রিয় ছিল।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন জানান, তাঁরা এমন অনেক ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন, যাঁরা বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতৃস্থানীয় সদস্যও রয়েছেন।
তিনি বলেন, বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে বিপদগ্রস্ত ও বিশৃঙ্খল খাত হিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তাঁরা আন্দোলনকে বেছে নিয়েছিলেন।
পোশাক কারখানার আন্দোলনে শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করে উসকানিদাতাদের শনাক্ত করতে আরও উচ্চতর তদন্তের কথা জানিয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, এসব কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে সত্যিই এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন সংস্থাকে কাজে লাগানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে গঠিত মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন কাঠামোয় বেতন পাওয়ার কথা রয়েছে পোশাকশ্রমিকদের।