এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন আইজিডব্লিউ অপারেটর প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট কমিউনিকেশন লিমিটেড (ফার্স্টকম)। প্রতিষ্ঠানটির কাছে এ খাতের অন্যান্য কোম্পানির পাওনা আটকে রয়েছে আড়াই কোটি টাকা। ৪ কোটি টাকা পাবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এসব দেনা পরিশোধ ও ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে আবারো ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে বিটিআরসি। এজন্য বিটিআরসির নীতিমালায়ও আনা হয়েছে পরিবর্তন।
বিটিআরসির পক্ষ থেকে এ নিয়ে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আইজিডব্লিউ অপারেটরদের উদ্দেশে একটি নির্দেশনাও জারি করা হয়।
বিষয়টির বিরোধিতা করছেন দেশে বিদ্যমান অন্য আইজিডব্লিউ অপারেটররা। তাদের অভিযোগ, বিটিআরসির সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে তারা জোর আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু পরে প্রকাশিত বৈঠকের কার্যপত্রে বিষয়টিকে পুরোপুরি উল্টে দিয়ে দাবি করা হয়, ফার্স্টকমের কার্যক্রম শুরুতে সবাই একযোগে সম্মতি জানিয়েছে। এ দাবি পুরোপুরি মিথ্যা উল্লেখ করে আইজিডব্লিউ অপারেটররা বিটিআরসি চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠিও দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আইজিডব্লিউ অপারেটরস ফোরামের (আইওএফ) লিগ্যাল অ্যাডভাইজার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিটিআরসি একটি খেলাপি কোম্পানিকে নজিরবিহীন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। ফার্স্টকমকে আনতে তারা এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে যে অন্যান্য অপারেটরদের ব্যবসার অংশগ্রহণমূলক সমতা ও প্রতিযোগিতা নষ্ট করে দিয়েছে। আইজিডব্লিউ অপারেটরদের সুইচের পাসওয়ার্ড ও নিয়ন্ত্রণ বিটিআরসি নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে সবার প্রতি সমান আচরণ, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার কথা ছিল বিটিআরসির। কিন্তু তা না পেয়ে অপারেটররা চরম হতাশ।’
যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজিএসসি) তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্টকমের ইস্যুকৃত মোট শেয়ারের ৫৮ শতাংশের মালিক এস আলম গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান জেনেসিস টেক্সটাইল অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং লায়ন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড। বর্তমানে আদালতের নির্দেশে কোম্পানি দুটির সম্পদ ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে।
এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ার এবং আদালতের জব্দের আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে ফার্স্টকমের চেয়ারম্যান কাজী সালাউদ্দিন আহাম্মাদ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘শেয়ার বা মালিকানার বিষয়টি কোম্পানির সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে আমি গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
বকেয়া পরিশোধ না করায় ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ফার্স্টকমের কল ক্যাপাসিটি পুরোপুরি ব্লক করে দেয় বিটিআরসি। এরপর গত বছরের ২৫ মে সংস্থাটির এক নির্দেশনায় বলা হয়, ওই বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না করলে বিটিআরসির নেটওয়ার্ক কাঠামোর অংশ হতে পারবে না প্রতিষ্ঠানটি।
এরপর বিটিআরসি চলতি বছরের ১৫ মার্চ একটি সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ফার্স্টকমের বকেয়া তিন কিস্তিতে (২৫ মার্চ, ২৫ এপ্রিল ও ২৫ মে) পরিশোধের বিষয়ে আইজিডব্লিউ অপারেটরদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। এর পরদিন ১৬ মার্চ ফার্স্টকমকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয় বিটিআরসি। সভার কার্যপত্রে উঠে আসে, বকেয়ার সামান্য একটি অংশ (আংশিক) জমা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এর আগে গত বছরের ২ ডিসেম্বর কোম্পানিটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিল বিটিআরসি।
যদিও আইজিডব্লিউ অপারেটরস ফোরাম (আইওএফ) গত ২৫ মার্চ বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে জানায়, এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে ফার্স্টকমের কোনো সমঝোতা হয়নি। সভায় তারা বিষয়টিতে কোনো সম্মতিও জানায়নি।
চিঠিতে আইওএফ উল্লেখ করে, ফার্স্টকমের পক্ষ থেকে তিন কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তবে আইওএফের প্রতিনিধিরা জানান, এই প্রস্তাব নিজ নিজ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু বিটিআরসির কার্যবিবরণীতে প্রস্তাবটি সরাসরি সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়, যা সঠিক নয়। চিঠিতে কার্যবিবরণীটি সংশোধন করে নতুন করে প্রকাশের অনুরোধ জানায় আইওএফ।
এর মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আইজিডব্লিউ অপারেটরদের জন্য একটি নতুন নির্দেশনা জারি করে বিটিআরসি। এতে বলা হয়, আইজিডব্লিউ অপারেটররা ‘কমন ইন্টারন্যাশনাল পয়েন্টে’ (সিআইপি) সামগ্রিকভাবে অথবা ‘পৃথকভাবে’ ইন্টার অপারেটর এক্সচেঞ্জ (আইওএক্স) সুইচ স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
এর আগে আইজিডব্লিউ অপারেটরদের একটি কমন পয়েন্টে যুক্ত হয়ে সেবা দেয়ার নিয়ম ছিল। এই ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার শর্ত হিসেবে অপারেটরদের অগ্রিম ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হতো।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মূলত ফার্স্টকমকে বিশেষ সুবিধা দিতেই নির্দেশনায় এই ‘পৃথকভাবে’ যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন নির্দেশনার ফলে ফার্স্টকম ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান এবং অন্যান্য অপারেটরের অতীতের বকেয়া পরিশোধের শর্ত এড়িয়ে এককভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে।
এসব বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিটিআরসির ভূমিকার স্পষ্ট ব্যাখ্যা জরুরি বলে মনে করছেন।
বর্তমান বিতর্কের পেছনে অন্যান্য অপারেটরদের অসহযোগিতা ও আধিপত্যকে দায়ী করেছেন ফার্স্টকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কে আই বোরহান। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘আর্থিক সংকটের কারণে আমরা বিটিআরসির কাছে বকেয়া টাকা কিস্তিতে পরিশোধের আবেদন করেছিলাম। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তারা আমাদের তিন কিস্তিতে টাকা দেয়ার অনুমোদন দেয়। আমরা আমাদের প্রকৃত পাওনা পরিশোধ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। কিন্তু আইওএফভুক্ত অন্যান্য অপারেটররা ইচ্ছাকৃতভাবে একটি অযৌক্তিক হিসাব দেখিয়ে আমাদের কাজে বাধা দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আইজিডব্লিউ অপারেটরদের কমন সুইচটি (সিআইপি) নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। কিন্তু আইওএফের অন্য অপারেটররা পাসওয়ার্ড থেকে শুরু করে এর কারিগরি নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। তারা সেখানে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করেছে। আমরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে চাই এবং আমাদের লভ্যাংশ (রেভিনিউ শেয়ারিং) তাদের সঙ্গে ভাগ করতে রাজি না হওয়ায় তারা আমাদের সংযোগ দিচ্ছিল না।’
বিটিআরসির সর্বশেষ নির্দেশনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘অন্যান্য অপারেটররা বিটিআরসির বারবার দেয়া লিখিত নির্দেশ অমান্য করে আমাদের কমন সুইচে যুক্ত হতে দিচ্ছিল না। এ কারণেই বাধ্য হয়ে বিটিআরসি তাদের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পৃথক সংযোগ স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। এখানে ফার্স্টকমকে কোনো অন্যায্য সুবিধা দেয়া হয়নি, বরং একটি চক্রের বেআইনি নিয়ন্ত্রণ ভাঙা হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারীর সঙ্গে একাধিক মাধ্যমে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।