আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা হচ্ছে। বর্তমানে দেশি ফ্রিজ রেফ্রিজারেটর ও এসির ওপর উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। আগামী বাজেটে তা কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হতে পারে। এতে গ্রাহক পর্যায়ে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এনবিআরের কর কর্মকর্তারা জানান, ‘দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বেশি থাকায় সম্প্রতি দেশে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির আমদানি বাড়ছিল। তাই আমদানি কমিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিতে ভ্যাট কমানো হচ্ছে। আর বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানেরও ব্যবসায় কিছুটা কমেছে বলে আমরা খবর পাচ্ছিলাম।’
এ ছাড়া মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের উৎপাদন পর্যায়ে বৈশিষ্ট্যভেদে ভ্যাট সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুবিধাটি ২০৩০ সাল অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে কোনো মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ উৎপাদনকারী কোম্পানি যদি নিজেরা কমপক্ষে দুটি কম্পোনেন্ট বা উপকরণ বানায় এবং বাকি উপকরণ আমদানি করে দেশে সংযোজন করে, তাহলে উৎপাদন পর্যায়ে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সব উপকরণ আমদানি করে শুধু দেশে সংযোজন করে, তাহলেও ১০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়।
এদিকে জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রেও ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখা হচ্ছে। সমুদ্রগামী বড় জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট দিতে হবে না। ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই অব্যাহতি-সুবিধা থাকবে। তবে এই সুবিধা পেতে হলে ৫ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার বেশি জাহাজ আমদানি করতে হবে। চলতি অর্থবছরে এই ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন সেটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হলো।
এ ছাড়া এলপিজি গ্যাস আমদানিতেও সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট বহাল রাখা হচ্ছে আগামী অর্থবছরেও। বর্তমানে এলপি গ্যাস বাসাবাড়িতে রান্নার জ্বালানি, অটোগ্যাস স্টেশনে যানবাহনের জ্বালানি এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দাম কমতে পারে
বর্তমানে দেশে ওয়ালটন, ইলেকট্রোমার্ট, ট্রান্সকম, এসকোয়্যার, সিঙ্গার বাংলাদেশ, বাটারফ্লাই, র্যাংগ্স, ইলেকট্রা ইন্টারন্যাশনাল, মিনিস্টার, ভিশন, এলজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ফ্রিজ রেফ্রিজারেটর ও এসির ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ভ্যাটের হার ছিল ৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল।
সরকারে ভ্যাট ছাড়ের বিষয়টি এ খাতের ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাতে এসব পণ্যের দামও কমবে বলে জানান তারা। ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসি উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান আরএফএল গ্রুপ। জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির চাহিদা বাড়ছে। ভ্যাট কমানো হলে সেটা স্থানীয় শিল্পের জন্যও ভালো হবে। ভ্যাট কমলে অবশ্যই দাম কমবে।’
দাম কতটা কমবে—জানতে চাইলে তিনি জানান, ভ্যাটে যতটা ছাড় দেওয়া হবে, সেটা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে যাবে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান প্রচণ্ড গরমের কারণে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির চাহিদা বেড়েছে। তাই এ সময়ে নতুন করে ভ্যাট ছাড়ের সিদ্ধান্ত গ্রাহক পর্যায়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।
চ্যালেঞ্জিং সময়ে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সুখবর বলে মনে করছেন উৎপাদনকারীরা। জানতে চাইলে যমুনা ইলেকট্রনিকসের পরিচালক (বিপণন) সেলিম উল্যা সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে এ খাত চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ৩০ শতাংশ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এখন ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত হলে তাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে।’
তবে উৎপাদনকারীদের পক্ষ থেকে ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল এনবিআরের কাছে।