দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অস্থিরতার মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে এসেছে বড় ধরনের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ নিয়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতে খেলাপিঋণের চাপ এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা— সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন— এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ব্যবসার খরচ কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিময় হার, সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। তার ভাষায়, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সুদের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি এবং বিনিময় হারও অনেকটা প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা এখনও ফিরে আসেনি।
তিনি বলেন, ‘‘দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে— যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক সংকেত। ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন, নতুন শিল্প স্থাপন কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ভয়াবহ পতন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালের নভেম্বরেও এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
২০২৬ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা। তবে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও নতুন বিনিয়োগের গতি কমে গেছে। ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক বড় শিল্পগ্রুপ কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও ব্যবসার মূল সংকটগুলো এখনও রয়ে গেছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ঘাটতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত অস্পষ্টতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে দিয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ব্যবসা পরিচালনার খরচ, লজিস্টিক দুর্বলতা ও মূল্যস্ফীতির মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলোর কোনও কার্যকর সমাধান হয়নি। ফলে বিনিয়োগের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আসেনি।’’
উচ্চ সুদে ব্যবসা চাপে
বর্তমানে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পঋণের সুদহার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এ ধরনের সুদে উৎপাদনমুখী শিল্প পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই ব্যবসার খরচ কমাতে হবে। এজন্য জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা জরুরি। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়।
ব্যাংকারদের একাংশ বলছেন, খেলাপিঋণের চাপ এবং সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে ব্যাংকগুলো এখন উচ্চ সুদে ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাত কার্যত ঋণবঞ্চিত হয়ে পড়ছে।
সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে
অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সরকারের দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যাংক ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকায়। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা আরও বেড়েছে। জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হতে পারে। কারণ ব্যাংকগুলোর বড় অংশের তহবিল সরকারি ঋণে চলে গেলে শিল্প ও ব্যবসা খাত পর্যাপ্ত অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়। এতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বাজেট ব্যয় মেটানো এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সামাল দিতে সরকারকে ব্যাপক হারে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা আর্থিক খাতে চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে “ক্রাউডিং আউট” পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে।
বর্তমানে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে উচ্চ সুদে ব্যাপক ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর কাছেও এটি তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পঋণের পরিবর্তে তারা সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের বড় অংশের আয় আসছে ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি কমলেও অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেট বাস্তবায়নের চাপ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদেশি ঋণ ও বাজেট সহায়তার প্রবাহও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসছে না। এ অবস্থায় সরকার পরিচালন ব্যয়, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, সরকার এখন সহজ সমাধান হিসেবে ব্যাংক ঋণের পথ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হতে পারে।
তার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি, খাদ্য ও আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে ভর্তুকির চাপও বাড়বে। অপরদিকে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে অস্পষ্টতা
ব্যাংকারদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল অগ্রাধিকার কী— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, তা স্পষ্ট নয়।
ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ, ট্রেড ফাইন্যান্সে সুদসীমা নির্ধারণ এবং বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধিও ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করছে। ব্যাংকারদের মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চান না।
খেলাপিঋণ ও বড় ঋণ তদারকিতে কঠোরতা
ব্যাংক খাতে অতীতের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বড় ঋণের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বিতরণ করা ২০ কোটি টাকার বেশি প্রতিটি ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন যাচাই করছে—ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, জামানত সঠিক আছে কিনা এবং ঋণের অর্থ যথাযথ খাতে ব্যবহার হয়েছে কিনা।
ব্যাংকাররা বলছেন, অতীতে ভুয়া জামানত, বেনামি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, এখন তা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
তবে মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত সংকোচনমূলক নীতি নেওয়া হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারে। ফলে আগামী বাজেটে সরকারকে একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আরেকদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
কী হতে পারে সমাধান
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী বাজেটে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি— কর ফাঁকি রোধ ও করজাল সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, খেলাপিঋণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ, বেসরকারি খাতের জন্য সাশ্রয়ী ঋণ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত স্থিতিশীলতা তৈরি করা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় শুধু বড় বাজেট দিলেই হবে না, বরং সেই বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেটিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হবে না।