উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপের মধ্যে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এমন একসময়ে সরকার একদিকে হৃদরোগ ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে, অপরদিকে রাজস্ব বাড়াতে সিগারেট ও অ্যালকোহলজাত পণ্যে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। একইসঙ্গে নেওয়া হচ্ছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন বাজেট। প্রশ্ন উঠছে, এই বাজেট কি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে, নাকি বাড়তি কর ও মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি করবে?
অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট খাতের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সক্রিয় আলোচনা চলছে। বিশেষ করে হার্টের রিং (কার্ডিয়াক স্টেন্ট), ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামালে কর কমানো বা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অপরদিকে তামাক ও মদের ওপর কর বাড়িয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার এখন দুই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। একদিকে রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ, আরেক দিকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জ। ফলে এবারের বাজেট অনেকটাই ‘স্বস্তি ও চাপের মিশ্র বাস্তবতা’ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যয়ে বিপর্যস্ত পরিবার
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকির একটি। সরকারি হাসপাতালেও রোগীদের ওষুধ, ডায়াগনস্টিকস, অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য-অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর বহু পরিবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে। অনেকেই চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমি বিক্রি করছেন, ঋণ নিচ্ছেন কিংবা সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের উদ্যোগকে বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
হার্টের রিংয়ে ভ্যাট ছাড়ের পরিকল্পনা
বর্তমানে দেশে করোনারি স্টেন্ট বা হার্টের রিং সরবরাহের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এর পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত রোগীকেই বহন করতে হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আগামী বাজেটে এই ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে হৃদরোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে একটি স্টেন্টের দাম মানভেদে ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। ভ্যাট তুলে দিলে উচ্চমূল্যের স্টেন্টের ক্ষেত্রে প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমতে পারে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে অন্তত ৪৫ হাজার করোনারি স্টেন্ট ব্যবহৃত হয়। ফলে কর ছাড় কার্যকর হলে বিপুল সংখ্যক রোগী সরাসরি উপকৃত হবেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদরোগ এখন দেশে নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। কিন্তু উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে বহু রোগী সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। ফলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ডায়ালাইসিস রোগীদের জন্য স্বস্তির আশা
কিডনি রোগীদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে হয়— এমন রোগীদের মাসিক চিকিৎসা ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই ৫০ হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা রোগীদের মাসিক গড় ব্যয় ৪৬ হাজার টাকার বেশি। এর ফলে প্রায় ৯৩ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির ওপর থাকা ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর কমানো গেলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ডায়ালাইসিস ব্যয় কিছুটা কমে আসবে। যদিও পুরো সুবিধা রোগীরা পাবেন কিনা, সেটি নিশ্চিত করতে বাজার তদারকিও জরুরি।
ওষুধ শিল্পে নতুন প্রণোদনা
এবারের বাজেটে দেশীয় ওষুধ শিল্পের জন্যও বড় ধরনের কর সুবিধা আসতে পারে। বিশেষ করে ‘অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’ (এপিআই) উৎপাদনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নতুন কর প্রণোদনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের ওষুধ শিল্পের বড় অংশের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে এপিআই উৎপাদন বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং স্থানীয় শিল্প শক্তিশালী হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের এই কর ছাড়গুলো কেবল মানবিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সিগারেট ও মদে বাড়তি কর
স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের বিপরীতে সরকার তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এনবিআর সূত্র জানায়, প্রিমিয়াম, উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন—সব স্তরের সিগারেটের দাম বাড়তে পারে। বর্তমানে সিগারেটের খুচরা মূল্যের প্রায় ৮৩ শতাংশই কর হিসেবে আদায় করে সরকার। বাংলাদেশে বর্তমানে ‘এড-ভেলোরেম’ পদ্ধতিতে কর আদায় করা হয়। অর্থাৎ পণ্যের দাম যত বাড়ে, করও তত বাড়ে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তামাকজাত পণ্য থেকে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আসে। আগামী বাজেটে এই খাত থেকে আরও অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিগারেটের দাম বাড়ানো শুধু রাজস্ব আহরণের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও একটি কার্যকর উপায়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ধূমপান কমাতে উচ্চ কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মদের ওপর প্রতি লিটারে ৪০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে এখন ‘সিন ট্যাক্স’ বা ক্ষতিকর পণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপের প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটছে।
সিগারেট কোম্পানির লবিং নিয়ে বিতর্ক
এদিকে বড় সিগারেট কোম্পানিগুলো বর্তমান কর পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা ‘এড-ভেলোরেম’ পদ্ধতির পরিবর্তে ‘সুনির্দিষ্ট কর কাঠামো’ চালুর দাবি তুলেছে। তাদের যুক্তি, এতে কর ব্যবস্থা সহজ হবে। তবে এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদ্ধতি চালু হলে সরকারের রাজস্ব কমে যেতে পারে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা হিসাব করে দেখেছি, স্পেসিফিক ট্যাক্স চালু হলে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব কমে যেতে পারে।” বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে কোম্পানিগুলো নিজেদের মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ পাবে এবং সরকারের মূল্যনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দুর্বল হবে।
তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি: সাহসী উদ্যোগ নাকি বাড়তি ঝুঁকি?
এদিকে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের রেকর্ড বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।” সরকার বলছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমেই অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, আগামী বাজেট বাস্তবসম্মত হবে নাকি ‘অলৌকিক প্রক্কলন-নির্ভর’ হবে। তার মতে, অতীতে উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ বাস্তবায়ন হয়নি। সেখানে আবারও অত্যন্ত বড় এডিপি নেওয়া অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
করের বোঝা কি আবারও সাধারণ মানুষের ঘাড়ে?
অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের করব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি অত্যধিক পরোক্ষ করনির্ভর। ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, উৎসে কর—এসব কর ধনী-গরিব সবাইকে একই হারে দিতে হয়। ফলে একজন রিকশাচালক ও একজন কোটিপতি ব্যবসায়ী একই পণ্যে একই হারে ভ্যাট দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের করব্যবস্থা বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেয়। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, “যেখানে নিশ্চিত ভ্যাট আদায় হয়, এনবিআর সেখানেই কর বাড়ায়। কিন্তু প্রকৃত আয়কর আদায়ে তারা ঝুঁকি নিতে চায় না।”
অপরদিকে কর ফাঁকি, অর্থপাচার ও সম্পদ গোপনের মতো বড় অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ মনে করেন, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ায় ধনীদের ওপর কার্যকর কর আরোপ প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো হবে, অথচ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন না করে। কারণ একদিকে সরকারকে বড় উন্নয়ন ব্যয় চালাতে হবে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও চাপ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, ব্যয়ের গুণগত মান এবং কর ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত সংস্কারই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হার্টের রিং, ডায়ালাইসিস ও ওষুধে কর ছাড় বাস্তবায়িত হলে লাখো রোগী স্বস্তি পাবেন—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু একইসঙ্গে যদি ভোগ্যপণ্য, প্রযুক্তিপণ্য ও দৈনন্দিন সেবায় নতুন করের চাপ বাড়ে, তাহলে সেই স্বস্তির বড় অংশ আবারও মূল্যস্ফীতির চাপে হারিয়ে যেতে পারে।