Image description

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় জমে উঠেছে অনলাইনে গরু কেনাবেচার বাজার। বিশেষ করে ঢাকার সাভার-বিরুলিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা খামারগুলো এবারও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কোরবানির পশু বিক্রিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই বাণিজ্য একদিকে যেমন নগরবাসীর কেনাকাটাকে সহজ করছে, অন্যদিকে খামারিদেরও দিচ্ছে সরাসরি বিক্রির সুযোগ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। ফলে দেশে ২২ লাখের বেশি পশুর উদ্বৃত্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় এ বছর বিদেশ থেকে পশু আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না, যা স্থানীয় খামারিদের জন্য ইতিবাচক বার্তা।

বাংলাদেশে কোরবানির পশুর বাজার দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক খাত। প্রতিবছর প্রায় এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়, যার বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে অনলাইনে পশু কেনাবেচার পরিমাণ এখনও তুলনামূলক কম হলেও গত কয়েক বছরে এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় থেকে অনলাইনভিত্তিক পশু বিক্রি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।

সরকারি প্ল্যাটফর্ম ‘ডিজিটাল হাট’সহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স সাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক খামার এখন অনলাইনে পশু বিক্রিতে সক্রিয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৪০৯টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ৬১৪টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজের মাধ্যমে প্রায় ৮৫ হাজার ৬২৬টি পশু বিক্রি হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। এবারও তার কম হবে না বরং বেশিই হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইনে পশু কেনাবেচার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় বাঁচে ও ঝামেলা কম। রাজধানীর ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে ক্রেতারা এখন ঘরে বসেই ভিডিও, লাইভ প্রদর্শনী ও ওজন যাচাইয়ের মাধ্যমে পশু নির্বাচন করতে পারছেন। পাশাপাশি রয়েছে বাসায় ডেলিভারি ও কোরবানির পর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধাও।

ঢাকাকে ঘিরে গরুর খামার

ঢাকার সাভার-বিরুলিয়া অঞ্চল বর্তমানে রাজধানীর কোরবানির পশু সরবরাহের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সাভারের বিরুলিয়া, আক্রান বাজার, ভাকুর্তা ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য খামারে দেশি, শাহিওয়াল ও শংকর জাতের গরু প্রাকৃতিক খাদ্যে মোটাতাজা করা হয়। এসব খামারের অনেকগুলোই সারা বছর ডেইরি ও গরু পালন করলেও ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়।

এবারের বাজারে অ্যামিন মোহাম্মদ অ্যাগ্রো, প্রয়াস অ্যাগ্রো ফার্ম, এসএস অ্যাগ্রো, ক্যাপ্টেনস অ্যাগ্রো ফার্ম ও আরকে অ্যাগ্রোর মতো খামারগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে গরুর বিক্রি করে। তারা অনলাইন বুকিং, লাইভ ভিডিও, খামার পরিদর্শন, ঢাকায় হোম ডেলিভারি এবং কোরবানির পর প্রসেসিং সুবিধা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক খামারের পশু আগাম বুকিং হয়ে গেছে বলেও জানা গেছে।

খামারিরা বলছেন, অনলাইনে সরাসরি বিক্রির সুযোগ থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমছে এবং লাভও তুলনামূলক বাড়ছে। তবে পশুখাদ্য, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি।

সাভারের বিরুলিয়ার আকরান বাজারের কাছে অবিস্থত আমিন মোহাম্মদ অ্যাগ্রো ফার্মে গিয়ে দেখা যায়, এবারের ঈদের জন্য তারা যতগুলো গরু তুলেছিল তার সবই ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।

ফার্মের ব্যবস্থাপক মারুফুর রহমান মুন্না স্ট্রিমকে বলেন, ‘এবার কোরবানির জন্য আমরা ২৩০টি গরু লালন-পালন করেছিলাম। ইতিমধ্যেই সব গরুর বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো কাস্টমার আসছে।’

তিনি আরও জানান, ‘আমরা ২০২৪ সালে প্রথম অনলাইনে গরুর বিক্রি শুরু করি। এ বছর খামারগুলোতে গরু কম তাই দ্রুত বিক্রি হয়ে গেছে। হাট-বাজারেও এবার গরু কম উঠতে পারে। তাই ঈদের আগে দাম আরও চড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

এই সময় ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে গরুর কিনতে আসা সালাম নামের এক ক্রেতার সঙ্গেও কথা হয় স্ট্রিম প্রতিবেদকের। তিনি জানান, গতবারও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে বিরুলিয়া এলাকার খামার থেকে গরু কিনেছেন। এবারও তাই গরু কিনতে এসেছেন। তবে আমিন মোহাম্মদ অ্যাগ্রো ফার্মে এসে জানতে পারেন গরু শেষ হয়ে গেছে। তাই তিনি এখন অন্য খামারে যাবেন। গরু কেনার পর খামার থেকেই গরু তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে।

প্রয়াস অ্যাগ্রো ফার্মের রিফাত হোসেন বলেন, ‘ক্রেতারা মনে করেন পাবলিক পশুর হাটগুলো খুবই অপরিচ্ছন্ন ও ভিড়পূর্ণ। তাই অনেকেই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পশু কিনতে সরাসরি আমাদের খামারে আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমরা হোম ডেলিভারির সুবিধাও দিচ্ছি। ইতিমধ্যেই এই ঈদের জন্য তোলা আমাদের অর্ধেকের বেশি গরুর বিক্রি হয়ে গেছে।’

গ্রিন ফার্ম হাউসের মালিকে সাইদুল কুদ্দুস স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা এবার কোরবানির জন্য ৩০০টি গরু তুলেছি। ইতিমধ্যেই ২৮০টি গরুর বিক্রি হয়ে গেছে। বাকিগুলোও দ্রুত বিক্রি হয়ে যাবে। গ্রাহকরা অনলাইনে সরসারি অর্ডার করলে আমরা ফ্রিতেই গরু পাঠিয়ে দিই।’

তিনি জানান তার খামার করোনা মহামারীর সময় থেকে পুরোপুরি অনলাইনে গরুর বিক্রি শুরু করে। তার প্রতিষ্ঠানের বয়স ২৫ বছরের বেশি। অনলাইনে গরু বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিরুলিয়া এলাকায় আরও বহু অস্থায়ী খামারও তৈরি হয়েছে, যারা শুরু অনলাইনে বিক্রির জন্য গরু পালেন।

তবে অনলাইন বাজারের বিস্তার ঘটলেও রাজধানীর অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাট এখনও মূল বেচাকেনার কেন্দ্র হিসেবেই রয়েছে। চাহিদা মেটাতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) স্থায়ী গাবতলী হাটের পাশাপাশি বেশহ কিছু অস্থায়ী পশুর হাট স্থাপন করছে। মিরপুর, পোস্তগোলা, শাহজাহানপুর, আফতাবনগর, কালশী, বাড্ডার মতো এলাকার খালি জমি, নদীর তীর, ক্লাব মাঠ এবং খোলা মাঠে এই হাটগুলো স্থাপন করা হচ্ছে।

তবুও নগরজীবনের ব্যস্ততা, যানজট ও নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রতি বছরই অনলাইনভিত্তিক পশু কেনাবেচার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন ও অস্থায়ী হাট দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ে দেশের কোরবানির পশুর বাজারে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা সহজ করছে, তেমনি স্থানীয় খামারিদেরও দিচ্ছে বড় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ।