Image description

সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার উদ্যোগে যুগ যুগ ধরে কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের রেওয়াজ থাকলেও এবারের ঈদুল আজহায় তা বর্জনের ডাক দিয়েছে দেশের শীর্ষ কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন ‘কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ’। 

সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সিলেট বিভাগের কওমি মাদ্রাসাগুলো এবার কোনো ধরনের কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করবে না। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রথম সারির বেশ কিছু কওমি মাদ্রাসাও চামড়া সংগ্রহ না করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আসন্ন ঈদের আগে কওমি মাদ্রাসাগুলোর পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে এই বর্জনের ঘোষণা আসতে পারে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ষড়যন্ত্র ও অকার্যকর সিদ্ধান্ত’, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ব্যর্থতা’ এবং বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ‘উদাসীনতা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবকে’ দায়ী করে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শীর্ষ কওমি শিক্ষাবোর্ড ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা।

কওমি মাদ্রাসাগুলোর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের চামড়া শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কারণ, দেশে বছরে উৎপাদিত মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশই সংগৃহীত হয় কুরবানির ঈদে, যার সিংহভাগ আসে মাদ্রাসার মাধ্যমে। উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে হতাশা থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অন্যদিকে, চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করলে কাঁচামাল সংকটে ট্যানারি শিল্প স্থবির হয়ে পড়বে এবং সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে চামড়া পাচারের ঝুঁকি তৈরি হবে।

কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরজুড়ে সর্বসাধারণের দান, মৌসুমী চাঁদা এবং কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি থেকে অর্জিত আয়ই কওমি মাদ্রাসা ও এর আওতাধীন লিল্লাহ বোর্ডিং (এতিমখানা) পরিচালনা এবং অবহেলিত এতিম শিশুদের ভরণপোষণের প্রধান উৎস। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই আয়ের খাতটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়া নতুনবাগ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসার এই আয়ের উৎস বন্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে চামড়ার বাজারে দরপতন ঘটায়। ফলস্বরূপ, এক সময়ের ‘নগদ সোনা’ খ্যাত কুরবানির চামড়া শেষ পর্যন্ত মূল্যহীন পণ্যে পরিণত হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া সংরক্ষণের জন্য মাদ্রাসায় কাঁচা লবণ সরবরাহ করলেও, মূল সিন্ডিকেট না ভাঙায় তা অযৌক্তিক ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, গত বছর চামড়া বিক্রি করেও লবণ কেনার টাকাও ওঠেনি।’

মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের মূল অভিযোগ বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চামড়া শিল্পের সুদিন ফিরবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত ‘১৮০ দিনের অগ্রাধিকার প্রকল্প’ বা ‘১০০ দিনের সংস্কার কর্মসূচির কোনোটিতেই চামড়া শিল্প নিয়ে কোনো রূপরেখা বা দূরদর্শী পরিকল্পনা নেই। আগের সেই শক্তিশালী বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভাঙতেও কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সার্বিক এই বঞ্চনা ও চরম হতাশা থেকেই আগামী কুরবানির মৌসুমে দেশব্যাপী চামড়া সংগ্রহ না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন তারা।

এদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলোর এমন ঘোষণায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। শুক্রবার বিকালে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের আয়োজনে ৪৭তম বিভাগীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বয়স মাত্র আড়াই মাস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে চামড়া বাজারের মতো একটি খাতের আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। বাংলাদেশ একদিন চামড়া শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করবে। তবে এর জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর ভুল নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে এই খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এটি ভাঙতে বদ্ধপরিকর। আমি কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করব, তারা যেন হতাশা থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন এবং জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করেন। প্রয়োজনে মাদ্রাসা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমরা দ্রুতই জরুরি বৈঠকে বসব।’

কওমি মাদ্রাসার এই বর্জনের ডাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)-এর একজন শীর্ষ নেতা বলেন, ‘মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা তৃণমূল পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ না করলে সাধারণ মানুষ চামড়া কোথায় রাখবে? চামড়া দ্রুত লবণজাত করতে না পারলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। এতে ট্যানারিগুলো কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের বিলিয়ন ডলারের চামড়া রপ্তানি খাতে।’

ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করলে কাঁচা চামড়ার দাম জিরোতে নেমে আসবে। এই সুযোগে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে কোটি কোটি টাকার চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে কুরবানির চামড়ার মূল্য পতন দেশের অর্থনীতিতে একটি কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। ২০১৩ সালেও যে গরুর চামড়া প্রতিটি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা নেমে আসে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। অনেক স্থানে দাম না পেয়ে ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার সংস্কৃতিই এই ধসের জন্য দায়ী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যদি অবিলম্বে কওমি মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে এবং কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিকল্প কোনো ‘ব্যাক-আপ প্ল্যান’ তৈরি না করে, তবে আগামী কুরবানির ঈদে চামড়া শিল্পে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে সরকার এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্রুত একটি সমঝোতা ও কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।