Image description

নতুন সরকারের ব্যাংক ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ক্ষমতাগ্রহণের মাত্র ৫২ দিনে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে বর্তমান সরকার। সরকারের দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এবারের বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। সেখানে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেওয়া ঋণ ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন ব্যাংকে বিনিয়োগ এবং জাতীয় নির্বাচন ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ করতে হয়েছিল সরকারকে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে অর্থবছরের আট মাসে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে আছে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকা। ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চাহিদা পূরণ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস ৯ দিনে সরকার ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছে, তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৬৫ হাজার ৬৮৫ কোটি বা ১৩৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে সরকার নিট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৭৬ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেই সরকারের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে রাজস্ব আদায় সে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে এবং আগামী দিনে তা পূরণের সম্ভাবনাও কম।

তিনি আরো জানান, রাজস্ব আয়ের বাইরে বাজেটের ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকেও ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারের ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, যদিও অর্থবছর শেষ হতে এখনো তিন মাস বাকি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছর শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের মোট ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি ছিল চার লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকায়। ফলে অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস ৯ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৮৯ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ৯৩ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গত অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা। ফলে এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৪৬ হাজার ২৩১ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছিল। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ দ্রুত বাড়ছে।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৯৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে নিট ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যা গত চার অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি ওই অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা কম ছিল।

প্রতি বছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট পেশ করে আসছে সরকার। এ ঘাটতি মেটানো হয় মূলত দুটি উৎস থেকে—অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত। বৈদেশিক খাত থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাওয়া না গেলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয় সরকারকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক ব্যবস্থা, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি এবং সঞ্চয়পত্র খাত।