বাংলাদেশে বিএনপির নতুন সরকার এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া বা ওই পদে পরিবর্তনের চিন্তা করছে না। রাষ্ট্রপ্রধানের পদে পরিবর্তনের প্রশ্নে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলেই সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানাচ্ছে।
তবে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন প্রশ্নে নানা আলোচনা চলছে রাজনীতিতে। এমনকি বিএনপির কারা রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, অনেক নাম দিয়েও খবর হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমেও রয়েছে অনেক নাম নিয়ে আলোচনা। দলটির নেতা-কর্মীদেরও অনেকে ধারণা করছেন, রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসতে পারে।
যদিও বিএনপির নীনিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে। ফলে সংবিধান অনুযায়ী এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয় নেই।
তারা এই প্রশ্নও করছেন যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্ন কেন তোলা হচ্ছে?
প্রসঙ্গত, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল পাঁচ বছর মেয়াদে রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্বে আসেন মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু মেয়াদ রয়েছে, সেখানে মো. সাহাবুদ্দিন যদি পদত্যাগ না করেন অথবা তাকে অভিশংসন বা অপসারণ না করা পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনগত সুযোগ নেই।
কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে আলোচনায় আসছে, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি সরকার চাইলেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে, সেটা তারা করবে কি না।
আসলে কী করবে বিএনপি
রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের প্রশ্নে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো তাদের শীর্ষ পর্যায়ের অন্য নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা করেননি বলে জানা গেছে।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আরেকজন নেতার বক্তব্য হচ্ছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর সেই আন্দোলনের নেতৃত্বের একটা আংশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি তুলেছিল। বিএনপি নেতাদের অনেকের ধারণা, সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের একটা অংশও ওই দাবির পেছনে ছিল।
সে সময় সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা উল্লেখ করে বিএনপি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবির বিপক্ষে। তখন তাদের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়া হলে দেশে সংবিধান ও আইন বহির্ভূত একটা অরাজকতা বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কোনো কোনো মহল সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল।
সেই উদাহরণ টেনে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতা জানান, বিএনপি এবং তাদের সরকার এখন পর্যন্ত সংবিধান সমুন্নত রাখার পুরোনো অবস্থানেই আছে। বিএনপি নেতৃত্ব নতুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনসহ সামনে চলার ক্ষেত্রে সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলছেন। সে অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী ১২ মার্চ।
সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এখন জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এই ভাষণেরও বিরোধিতা করছে। তারা রাষ্ট্রপতিকে সংসদে অভিশংসন বা অপসারণের দাবিও তুলেছে।
তাদের যুক্তি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হচ্ছে। সেই সংসদে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে পারেন না।
এনসিপির এই অবস্থানের প্রতি সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীরও সমর্থন রয়েছে বলে দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, এনসিপি ও জামায়াতের এমন অবস্থান পুরোনো ও রাজনৈতিক। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই তাদের এই অবস্থান ছিল রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে।
বিএনপি অবশ্য এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের ওই অবস্থানকে আমলে নিচ্ছে না। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এর মানে বিএনপি সরকার এখনই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের পথে যাচ্ছে না এবং পরিবর্তন করতে চাইলে সেজন্য সময় নেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সরকারের ভেতরেও এ নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা নেই বলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
আর বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান যেহেতু দলের বা সরকারের অন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা করেননি। ফলে তারা সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখার পুরোনো অবস্থানেই থাকার কথা বলছেন।
কিন্তু ভিন্নমতও আছে বিএনপির সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সেখানে ভিন্ন রাজনীতির কাউকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বহাল রেখে সংবিধান সমুন্নত রাখার বিষয়টি তাদের কাছে যৌক্তিক নয়।
তাদের বক্তব্য হচ্ছে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারই সংবিধান সমুন্নত রাখবে এবং বিএনপি চাইলেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে। তবে যারা আপাতত রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন চান না, তারা চান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেন তাদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির মেয়াদ থাকে। আপাতত রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন না করার চিন্তার পেছনে এটি অন্যতম যুক্তি হিসেবে আসছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রস্তুতি
যদিও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদে ভাষণ দেওয়ার বিরোধীতা করছে এনসিপিসহ বিভিন্ন দল। কিন্তু বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ তৈরি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আলোচনাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংসদের জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ এখন প্রস্তুত।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণে কি থাকবে, তা সরকারের পক্ষ থেকে ঠিক করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করতে হয়। অর্থ্যাৎ যখন যে রাজনৈতিক সরকার থাকে, সংসদের প্রথম অধিবেশনে বা বছরের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে সেই সরকারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
এর আগে রাষ্ট্রপতিরা সেভাবেই ভাষণ দিয়েছেন সংসদে। শুধু ব্যতিক্রম করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে তাদের প্রথম সরকারে এসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে।
তিনি পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি থাকার সময় সংসদে বছরের প্রথম অধিবেশনে তৎকালীন সরকার অনুমোদিত ভাষণ পড়তেন। তিনি ভাষণের শেষে গিয়ে দুএকটি বাক্য নিজ থেকে বলতেন এবং সেটাই শিরোনাম হতো সংবাদ মাধ্যমে।
আওয়ামী লীগের সেই সরকারের একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, এর পেছনে বিভিন্ন কারণের মধ্যে সংসদে বিচারপতি আহমদের স্বাধীনভাবে দুএকটি বাক্য বলার বিষয়টিও অন্যতম কারণ ছিল। যা নিয়ে সে সময় অনেক আলোচনাও হয়েছে।
এখন বিএনপি সরকার সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়ার ব্যাপারে যে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তাতেই নতুন সরকার সংবিধানের বিরোধীতাকারীদের জন্য একটা বার্তা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, আগের রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে বিএনপি সরকার তাদের যাত্রার প্রথম পর্যায়ে সংসদ গঠন করাসহ সাংবিধানিক কাজগুলো সেরে নিতে চাইছে। একইসঙ্গে সংবিধান সমুন্নত রাখার যে কথা দলটি বলে আসছে, সেই অবস্থানে থাকার ব্যাপারেও একটা বার্তা দেওয়া হচ্ছে বিরোধীদের প্রতি।
কিন্তু এমন অবস্থান নিয়ে বিএনপির ভেতরেও প্রশ্ন আছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যায় কখন
প্রথমত রাষ্ট্রপতির পদে থাকা ব্যক্তি নিজে থেকে পদত্যাগ করলে ওই পদ শূন্য হবে। তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো বাধা থাকে না।
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যেতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সংবিধান লঙ্ঘন ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ থাকতে হবে।
এই অভিশংসন প্রশ্নে সংবিধানে যা বলা আছে, সাধু ভাষায় ওই অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো––
১. এই সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যাইতে পারিবে; ইহার জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অনুরূপ অভিযোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পীকারের নিকট প্রদান করিতে হইবে; স্পীকারের নিকট অনুরূপ নোটিশ প্রদানের দিন হইতে চৌদ্দ দিনের পূর্বে বা ত্রিশ দিনের পর এই প্রস্তাব আলোচিত হইতে পারিবে না; এবং সংসদ অধিবেশনরত না থাকিলে স্পিকার অবিলম্বে সংসদ আহ্বান করিবেন।
২. এই অনুচ্ছেদের অধীন কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করিতে পারিবেন।
৩. অভিযোগ-বিবেচনাকালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকিবার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকিবে।
এছাড়া সংবিধানে বলা হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক অসামর্থের কারণে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা যায়। তখন সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়।
বিএনপি কী অভিশংসনের পথে যাবে?
অভিশংসন বা অপসারণ-এই উপায়গুলো অনুসরণ করলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর দায় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ওপর বর্তায় বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, এ মুহূর্তে এই দুই পথের কোনো পথই অনুসরণ করতে চান না তারা।
সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন নিজ থেকে পদত্যাগ করলে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।
প্রসঙ্গত, ভোটের আগে গত ডিসেম্বর মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি "অপমানিত বোধ করছেন"।
রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে হয় জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে। সংবিধান অনুযায়ী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে অভিশংসনের প্রয়োজন হয় না।
১২ই মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই নতুন স্পিকার নির্বাচিত হবেন। তবে, মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের প্রশ্নে তার সেই আগের অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন বক্তব্য এসেছে এখন।
সম্প্রতি একটি পত্রিকায় তার একটি সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিএনপি যদি মনে করে, তারা নিজেদের মতো রাষ্ট্রপতি চায়, সে ক্ষেত্রে আপনি কী করবেন?
জবাবে তিনি বলেছেন, যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে, সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব।
এদিকে, যদিও বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ কেউ বলছেন, অভিশংসন বা অপসারণের পথে যেতে চান না তারা।
কিন্তু সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের জন্য সংবিধানে থাকা যে কোনো উপায়ই ব্যবহার করতে পারে। সেখানে কোনো বিতর্ক কিংবা দায় এড়াতে অভিশংসন বা অপসারণের সেই পথে না গিয়েও বিএনপি চাইলে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের জন্য বলতে পারে। তাতে জটিলতা দেখেন না বিএনপি নেতাদেরই অনেকে।
সরকারের কোনো দায়িত্বে নেই, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এমন একজন নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আরও দুই বছর রয়েছে। এত লম্বা সময় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতিকে রাখা হবে, এটাও মনে করেন না তাদের অনেকে।
অন্যদিকে, সরকার ও বিএনপির নেতাদের যারা সংবিধান সমুন্নত রাখতে মো. সাহাবুদ্দিনকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপাতত বহাল রাখার কথা বলছেন, তাদের অবশ্য ভিন্ন একটা হিসাব-নিকাশ আছে।
সেটি যদি এভাবে বলা যায় যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংবিধান সংশোধন করে তিন মাস মেয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরত আনতে হবে।
সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখছেন বিএনপির ওই নেতারা। কারণ, বিএনপি সরকার এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করলে, তার মেয়াদও পাঁচ বছর পর এই সরকারের মেয়াদের সঙ্গে শেষ হবে।
ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে তখন বিএনপির রাষ্ট্রপতি থাকবে না। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেহেতু নির্বাচিত হবে না, সে সময় রাষ্ট্র প্রধানের পদে নির্বাচিত ব্যক্তি না থাকলে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক সংকট হতে পারে।
সেজন্য বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যাতে একটা যথাযথ সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতির মেয়াদ থাকে, সেটি চান সরকার ও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের অনেকে।
এমন প্রেক্ষাপটে মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রেখে তার মেয়াদ শেষে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা তার আগেও তাকে পরিবর্তনের সাংবিধানিক উপায় বিএনপির হাতে আছে।
ফলে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এখনই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রশ্নে চিন্তিত নন বলে মনে হয়েছে। তবে বিএনপির সাধারণ নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের প্রশ্নে তাদের শীর্ষ নেতা যেহেতু তার চিন্তা বা মনোভাব এখনো প্রকাশ করেন নি।
ফলে নতুন জাতীয় সংসদ যাত্রা শুরুর পর বিষয়টিতে দল ও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে যে, মো. সাহাবুদ্দিনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপাতত বহাল থাকছেন নাকি পরিবর্তন আসবে।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি সরকারের শপথ পড়িয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সাত মাস আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের পর ওই সরকারের প্রধানমন্তী-মন্ত্রীদের শপথ পড়িয়েছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ পড়ান বর্তমান রাষ্ট্রপতি। সর্বশেষ ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর তিনি শপথ পড়ান তারেক রহামানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে।