Image description

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে আলোচিত আসন ঝিনাইদহ-৪। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী রাশেদ খান ধরাশায়ী। স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা ফিরোজের আত্মবিশ্বাসও টিকল না। সব জল্পনা কল্পনাকে হার মানিয়ে আসনটিতে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হলেন জামায়াত প্রার্থী আবু তালিব। কিন্তু কেন? 

 

কালীগঞ্জ উপজেলা ও সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে আসনটি। সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন জরিপে ফিরোজের জয়জয়কার। তবে শেষ হাসি হাসলেন জামায়াত প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক মো. আবু তালিব। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক আব্দুল আওয়াল অবশ্য নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগে এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন আসনটিতে দাঁড়িপাল্লা ২৪ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজয় ছিনিয়ে নেবে। হয়েছেও তাই। 

কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না! ভোটের দুই দিন আগে স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের তাক লাগানো শোডাউন ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় ভুষণ সরকারি স্কুল মাঠে সমাবেশ শেষে করা শোডাউনে বিএনপির নেতাকর্মী ও সর্মথক ছাড়াও দেখা মিলেছে আওয়ামী লীগের লোকজনের। বিপুল সংখ্যায় অমুসলিম নারী-পুরুষ ঢাকঢোল নিয়ে অংশ নেন।

নির্বাচন অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, এ আসনে অমুসলিম ভোটার ৫০ হাজার ৮৩৬ জন। এরমধ্যে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ৪ ইউনিয়নে অমুসলিম ভোটার মাত্র ৭ হাজার ৩৬৬ জন। মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬১। সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ভোটার ৭৭ হাজার ৫৩৩ এবং কালীগঞ্জ উপজেলায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯২৮ জন। 

ফিরোজের ভাগ্যে জুটেছে ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট। অন্যদিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গণঅধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মো. রাশেদ খানের ধানের শীষ মার্কায় ভোট পড়েছে ৫৬ হাজার ২২৪। অর্থাৎ ফিরোজ ও রাশেদের প্রাপ্ত ভোট একত্রে করলে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৬ ভোট। বিজয়ী প্রার্থী জামায়াতের মো. আবু তালিবের দাঁড়িপাল্লায় ভোট পড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯৯। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করা ফিরোজের প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার পার্থক্য ২৪ হাজার ৮৯৫। কিন্তু ফিরোজ ও রাশেদের প্রাপ্ত ভোট মিলিয়ে তুলনা করলে দেখা যায় ২৭ হাজার ৩২৫ ভোট যা জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বেশি। 

সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নির্বাচন পূর্ব জরিপ কাপ-পিরিচ (ফিরোজের) বিপুল ভোটে জয়লাভের সম্ভাবনার তথ্য জানিয়েছিল। রাশেদ তৃতীয় স্থান অধিকার করবে- এমন তথ্য সঠিক হলেও দাঁড়িপাল্লা প্রথম স্থান লাভ করবে এমন তথ্য কেউ প্রকাশ করেনি। নীরব ভোটারদের নিয়ে শঙ্কা থাকলেও ফিরোজ কিংবা রাশেদ সেদিকে নজর দেয়নি। তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াত সব সময় ফিরোজকে সামনে নিয়ে এসেছে। জামায়াতের মজবুত ও টেকসই গোপন কৌশলের কাছে হারতে হয়েছে ধানের শীষ ও কাপ-পিরিচকে। এবারের নির্বাচনে নারী এবং নতুন ভোটারেরা বিজয়ীর পক্ষে বড় ভূমিকা রেখেছে। জন প্রতিনিধি নির্বাচনে নিজের ইচ্ছে প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে তারা।

বিএনপির ভরাডুবির পেছনে আরও যা পাওয়া গেল 

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মরহুম শহিদুজ্জামান বেল্টু। টানা দখলে রাখা আসনটি এ নির্বাচনে হারিয়ে ফেলে বিএনপি। আওয়ামী লীগের মরহুম আব্দুল মান্নান আসনটি দখলে নেন। পরবর্তী (২০১৪) আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ভারতে নিহত আনোয়ারুল আজিম আনারের দখলে থাকে। 

২০২৬ সালে বিএনপি আসনটি দখল করার জন্য প্রার্থী নির্বাচনে চমক সৃষ্টি করে; কিন্তু স্থানীয়রা পাত্তা দেয়নি। দলের হাইকমান্ড থেকে পাঠানো প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নেয় সিংহভাগ নেতাকর্মী ও সমর্থক। জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ জুন কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একেবারে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে দলটি। অবশ্য সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টু জীবিত থাকা অবস্থাতেই দলের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি হয়। গোড়ার খবর হলো বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় (৮ম জাতীয় সংসদ) তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মরহুম মসিউর রহমানের সঙ্গে অন্য তিন সাবেক এমপি আব্দুল ওহাব (ঝিনাইদহ-১), শহিদুল ইসলাম মাস্টার (ঝিনাইদহ-৩) এবং মো. শহিদুজ্জামান বেল্টুর (ঝিনাইদহ-৪) যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়। 

বেল্টু যখন এমপি ছিলেন সেই সময় বহুল আলোচিত হামিদুল ইসলাম হামিদ এমপির সেকেন্ড ম্যান হিসেবে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপিতে আবির্ভূত হন; কিন্তু বিধি হলো বাম। বেল্টু ও হামিদের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে থাকে। বিশাল এক মাদকের চালান আটক করে পুলিশ। অভিযোগ ওই সময় ৮ হাজার বোতল ফেনসিডিল আটক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় হামিদকে। বেল্টুর কাছ থেকে ছিটকে পড়ে সে (হামিদ)।

১/১১ পরবর্তী ঝিনাইদহ জেলার চারটি আসনে যারা বিএনপি এমপি ছিলেন তাদের অবস্থা নাজুক আকার ধারণ করে। পলাতক জীবনে দুর্নীতির মামলায় আটকে যান তারা। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির মামলার বিচারে মসিউর রহমান (ঝিনাইদহ-২) ও আব্দুল ওহাব (ঝিনাইদহ-১) দণ্ডিত হন। বাদ পড়েননি ঝিনাইদহ-৩ আসনের সাবেক এমপি মরহুম শহিদুল ইসলাম মাস্টার। কিন্তু শহিদুজ্জামান বেল্টু ১/১১ পরবর্তী সময়ে অন্যাদের তুলনায় নানা কৌশলে কিছুটা নিরাপদেই ছিলেন। 

দলীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধীরে ধীরে হামিদের নেতৃত্বে বেল্টু বিরোধী হয়ে উঠে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির বিশাল একটি অংশ। কালীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মাহবুবুর রহমানকে আহ্বায়ক ও হামিদুল ইসলাম হামিদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এতে করে বেল্টু ক্ষিপ্ত হন। তিনি নিজে পৃথক আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেন। উভয় গ্রুপের ধাওয়া পালটা ধাওয়া, মারধর, অফিস দখল চলতে থাকে। এছাড়া ১/১১ নিয়ে বিতর্কিত কথাবার্তা বেল্টুকে কোণঠাসা করে ফেলে। ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে। 

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সাবেক এমপি বেল্টুর মৃত্যুর পরে দুইটি গ্রুপ নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠে। নিজ নিজ নামে পরিচালিত গ্রুপগুলোর পরিণতি ভোগ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে (জাতীয় সংসদ)। সেই সময় ধানের শীষ নিয়ে ভোটের মাঠে নামেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তাকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপিতে নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয়। আওয়ামী লীগের দাপটে যখন বিএনপির তৃণমূলে হাহাকার। তখনও কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব বিভক্ত থেকেছে। ২০১৮ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে ছিলেন ফিরোজ। প্রবীণ নেতারা জানান, কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির একটি অংশ সবসময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। 

২০২৬ সালে ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। এবারও নামে নামে বিভক্ত গ্রুপগুলোর স্থানীয় বিএনপির সিংহভাগ নেতাকর্মী কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রাজপথে নেমেছে। তারা বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনধারী হয়ে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের দেওয়া প্রার্থীর বিরোধিতা করেছে। মিছিল মিটিংয়ে অসভ্য গালমন্দ করে ধানের শীষের প্রার্থী রাশেদ খানের বিরোধিতা করেছে। জেলা সভাপতি আব্দুল মজিদসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার নাম ধরে নেতিবাচক স্লোগান দেওয়া হয়েছে। 

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শহিদজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী মুর্শিদা খাতুন একটি গ্রুপের নেতৃত্বে চলে আসেন। ফিরোজ, হামিদ এবং  মুর্শিদা (বেল্টু) এক মঞ্চে উঠে রাশেদ খানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে প্রতিহত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়; কিন্তু কাজ হয়নি। 

বিএনপির হাইকমান্ড কঠোর অবস্থান নেন। নানা জটিলতার মধ্যেও রাশেদ খানকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামানো হয়। নিজ দল গণঅধিকার পরিষদ ত্যাগ করে শুধুমাত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করেন তিনি (রাশেদ)। অচেনা-অজানা পথহারা পথিকের মতো রাশেদ আশ্রয় খুঁজতে থাকেন। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পাওয়া রাশেদসহ চারজনই ছুটে যান কালীগঞ্জ। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে হামিদ আশ্রয় দেন তাকে (রাশেদ)।

দলীয় প্রতীক (গণঅধিকার পরিষদ) ট্রাক মার্কা নিয়ে ঝিনাইদহ-২ আসনে লড়াই করার জন্য মাসের পর মাস গণসংযোগ ও সভা সমাবেশ করেছেন রাশেদ। গরম গরম বক্তব্য দিয়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। টেলিভিশনের টকশোতে নিয়মিত কথা বলেছেন। 

আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচক রাশেদ খান জন্মেছেন ঝিনাইদহ সদর পৌরসভার মুরারীদহ গ্রামে। পড়ালেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।