ভূমিধস বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কি পুনর্মিলন নাকি প্রতিশোধের পথে হাঁটবে! এক্ষেত্রে বিএনপির চেয়ারম্যান সতর্ক পা ফেলছেন। তিনি বুঝেশুনে কথা বলছেন। শনিবার বাংলাদেশের নির্বাচনে বাজিমাত করা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া। এক পর্যায়ে তাকে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশে এখনও অনেক মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের সঙ্গে কী ধরনের পুনর্মিলন হওয়া উচিত? এ প্রশ্নে তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উত্তর দেন। স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত তারেক রহমান বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক জনজীবন থেকে সরে গেছেন। অনেকেই শুধু দলীয় সম্পৃক্ততার কারণে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, যদিও তাদের অনেকেরই সমালোচকদের ভাষায় স্বৈরাচারী ও কঠোর কর্মকাণ্ডে সরাসরি ভূমিকা ছিল না। তবে বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগের এখনও উল্লেখযোগ্য ভোটের ভিত্তি রয়েছে। ব্যালটে দলটির অনুপস্থিতিতে তাদের সমর্থকদের বড় অংশ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দিকে ঝুঁকেছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন আগামী নতুন সরকার এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে জনমনে আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ রয়েছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর যে নির্বিচার রাজনৈতিক হয়রানির ধারা দেখা গেছে, সেই একই পথে যেন না হাঁটে- সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। চ্যালেঞ্জ হবে- ভিত্তিহীন মামলা বাতিল করা। কিন্তু প্রকৃত সহিংসতার দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা।
২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তাদের ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ভোটারদের সামনে মূলত দুটি বিকল্প ছিল- বিএনপি অথবা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বেশির ভাগই বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন।
এই ভোটের ধারা পরিবর্তন একটি বড় কারণ জাতীয় পরিচয়বোধে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং পাকিস্তানের ভয়াবহ নির্যাতনের পরও তাদের অবস্থান ছিল পাকিস্তানপন্থী। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রধারার সমর্থকরা জামায়াতকে এখনও সন্দেহের চোখে দেখেন।
ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের দিকে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে বিএনপি। তারেক রহমানের ‘সমঅধিকারভিত্তিক বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তারা জামায়াতের রক্ষণশীল অবস্থানের তুলনায় বিএনপিকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখেছেন। এছাড়া সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে নিপীড়ন বন্ধের প্রতিশ্রুতিও নির্বাচনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল।
নারী ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জামায়াত প্রধানের নেতৃত্বে নারীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মন্তব্য এবং শরিয়াভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নারী ভোটারদের বিএনপির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমনকি জামায়াতের মিত্র ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) মধ্যেও ইসলামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে জোট নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ দেখা গেছে।
যদিও অনেক বাংলাদেশি ২০২৪ সালের আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ত হিসেবে দেখছেন, তবুও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়াকে কেউ কেউ একটি বাহ্যিক ‘ডিপ স্টেট’-এর কাজ হিসেবে বিবেচনা করছেন। ভবিষ্যতে যে কোনো দল একইভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় ভোটাররা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিএনপিকে স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ঘাঁটিগুলোতে কৌশলগত প্রচার এবং ভাসমান ভোটারদের লক্ষ্য করে বিএনপি সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। কিছুই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। নিশ্চিত করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ভোটারদের জন্য স্বাভাবিক বিকল্প হয়ে ওঠে বিএনপি, জামায়াত নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ক্লান্ত একটি জাতি এখন আশা করছে, তারেক রহমান প্রতিশ্রুত ‘আইনের শাসন’ই বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে পুনর্মিলনের সেতু হয়ে উঠবে।