নিষেধাজ্ঞার অন্ধকার ছায়া থেকে বেরিয়ে শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন আবার কেন্দ্রবিন্দুতে। আজ বাংলাদেশে ভোট—আর নতুন ইমেজ নিয়ে মাঠে নেমে জামায়াত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে কড়া চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। কিন্তু এর প্রভাব ভারত এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য কী হতে পারে?
********************
যুধাজিৎ শঙ্কর দাস
নয়াদিল্লি
“ভারতে তোমরা জামায়াতকে ঠিকমতো বোঝোনি”, বাংলাদেশের রাজনীতি আর সমাজ নিয়ে বহু বছর লেখালেখি করতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র সদস্য ও কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছ থেকে আমি এই কথাটা বারবার শুনেছি। সত্যি বলতে কী, আজ বাংলাদেশের ভোটের দিনে আমরা যে জামায়াতের উত্থান দেখছি, সেটা আমি নিজেও আগে কল্পনা করিনি, বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে।
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি, জামায়াত, বিএনপি, এমনকি বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গেও। মাঠপর্যায়ের তথ্যের ওপর ভর করে ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল ৪ আগস্ট ২০২৪-এ সবার আগে জানিয়েছিল যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন আসন্ন, শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার একদিন আগেই। তখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছিল, আর অন্য কেউ টেরই পায়নি।
৩00 আসনের জাতীয় সংসদের ভোটগ্রহণ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে, আর ফলাফল স্পষ্ট হয়ে যাবে ১৩ ফেব্রুয়ারির ভোররাতে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আপডেট জানতে আমাদের লাইভ ব্লগে চোখ রাখুন।
চলুন আবার জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে ফিরি। এটি একটি ক্যাডারভিত্তিক দল, আর সংগঠনগত গভীরতার দিক থেকে তাদের শক্তি আওয়ামী লীগের সমকক্ষ। এক সময় নিষিদ্ধ থাকলেও পরে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এর মাঝেই জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে জামায়াতের সদস্যরা এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।
দলের আমির শফিকুর রহমানসহ অনেক নেতা জেল খেটেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অপরাধের দায়ে সাবেক মন্ত্রীসহ দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসিও হয়েছে।
তবু মনে হচ্ছে জামায়াত যেন অতীতের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে মানুষ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকে একটি সুযোগ দিতে আগ্রহী।
কারণ জামায়াত ও তাদের জোট, যেখানে জুলাই আন্দোলনের নেতাদের গড়া এনসিপিও আছে, তারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অন্যদিকে, নির্বাচনে এগিয়ে থাকা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে তাদের একটি অংশের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের ভার সামলাতে হচ্ছে।
ঢাকাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল রহমান বলেন, “নতুন বন্দোবস্ত বা নতুন ধরনের রাজনীতির আকর্ষণ খুব শক্ত, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। কেউ কেউ এনসিপি-জামায়াত জোটকে পছন্দ না করলেও, তারা এটাকে নতুন রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখছে।” তবে তিনি যোগ করেন, “বিএনপি তাদের ঐতিহ্যগত রাজনীতির ধারায় স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।”
বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বি বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে লড়াইটা খুব কাছাকাছি।
“জনপ্রিয় ভোটের দিক থেকে নির্বাচন হবে হাড্ডাহাড্ডি। তবে আসন হিসেবে এখনো বিএনপি এগিয়ে থাকবে, যদিও জামায়াতের অঘটন ঘটিয়ে জয় পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
এক সময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী কীভাবে আবার বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র মঞ্চে উঠে এল?
যেসব তরুণ ভোটার শুধু শেখ হাসিনার শাসন দেখেই বড় হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে ততটা আবেগগতভাবে যুক্ত নয়, তারা এবারের নির্বাচনে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
জামায়াতের সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নকীবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে এখন প্রায় ৪ কোটি নতুন ভোটার আছে, যারা পুরনো ধরনের দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিনির্ভর রাজনীতিতে নিজেদের জন্য কোনো জায়গা দেখে না। তারা পরিবর্তন চায়।”
ড্যানিয়েল বলেন, ফল একপেশে হতে পারে, কিন্তু লড়াই মোটেও একপেশে নয়। “আগে আলোচনা ছিল বিএনপি ২৫০ নাকি ২৮০ আসন পাবে। এখন মানুষ উত্তেজিত, কারণ জরিপে বিএনপি আর জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস এসেছে।”
সাবেক জামায়াত সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নকীবুর রহমান ব্যাখ্যা করেন, শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে দলের তৃণমূল পর্যায়ের কাজ কীভাবে ফলাফলে প্রতিফলিত হতে পারে।
“গত দেড় বছরে জামায়াত সরাসরি মানুষের কাছে গেছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। অনেক নাগরিক এখন বুঝতে পারছে, জামায়াতকে অমানবিকভাবে উপস্থাপনের দীর্ঘদিনের প্রচারণা অতিরঞ্জিত ছিল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।”
বাংলাদেশে অনেকেই আমাকে বলেছেন, হাসিনা সরকারের পতনের পরের অস্থির সময়ে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করে জামায়াত তাদের আস্থা অর্জন করেছে। তখন জামায়াতের কর্মীরা পালা করে মন্দির ও হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর পাহারা দিয়েছে।
ঢাকা থেকে কথা বলতে গিয়ে ড্যানিয়েলও সেই প্রসঙ্গ তোলেন।
“গত দেড় বছরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পরিবারগুলোকে কেউ আশ্রয় না দিলে তারা টিকতে পারত না, কারণ শীর্ষ নেতৃত্ব গা ঢাকা দিয়েছিল। অনেক এলাকায় জামায়াতের লোকজনই হিন্দু পরিবারগুলোকে আশ্রয় দিয়েছে। আমি এমন অনেক ঘটনার কথা শুনেছি, যেখানে জামায়াত নেতারা আওয়ামী লীগ পরিবারের জন্য খাবার আর অর্থের ব্যবস্থা করেছে।”
নির্বাচনী হিসেবে জামায়াতের সেরা ফল ছিল ১৯৯১ সালে, তখন তারা ১২.১৩% ভোট পেয়ে ১৮টি আসন জিতেছিল। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে ক্ষমতার স্বাদও পেয়েছিল দলটি।
ইমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (EASD)-এর এক প্রাক-নির্বাচনী জরিপ, যা বুধবার দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত হয়, বলছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ১০৫টি আসন পেতে পারে। সেখানে বিএনপি জোটের সম্ভাব্য আসন ধরা হয়েছে ২০৮টি। ৪১,৫০০ জনের ওপর চালানো ওই জরিপে বলা হয়েছে, জামায়াত একাই পেতে পারে ৪৬টি আসন।
নকীবুর রহমান বলেন, “আমরা মানুষের কথা শুনেছি, কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি, শুধু কথায় নয়—কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছি যে আমরা সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই কারণেই এই গতি তৈরি হয়েছে।”
বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য জামায়াতের জয় কী অর্থ বহন করতে পারে?
২০২৪ সালের আগস্টের পর বিএনপির একটি অংশ যখন ধরে নিয়েছিল ক্ষমতা তাদের হাতেই চলে এসেছে এবং চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে, তখন অনেক জায়গায় জামায়াতের কর্মীরা রক্ষকের ভূমিকায় সামনে আসে। তবে ঢাকার কিছু বিশেষজ্ঞ আগেই সতর্ক করেছিলেন, নির্বাচনের আগে আর পরে জামায়াতের চেহারা এক নাও থাকতে পারে।
ড. মোহাম্মদ নকীবুর রহমান বলেন, “জামায়াতকে নিয়ে অনেক ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, তারা দলের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হননি।”
তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াত খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থী দিয়েছে। তার মতে, এই পদক্ষেপ আর প্রতিশ্রুতি হিন্দু ভোটারদের আস্থা অর্জন করবে।
এক বিদেশি সংবাদ পোর্টালে কৃষ্ণ নন্দী লিখেছেন, “জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে কোনো হিন্দুকে বাংলাদেশ ছাড়তে হবে না। কাউকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হবে না। বরং হিন্দুরা এই দেশে মর্যাদা, নিরাপত্তা আর সম্মান নিয়ে বসবাস করবে।”
বুধবার জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেন। আগস্ট ২০২৪-এর পর সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিজ্ঞতার কারণে এই উদ্বেগ অস্বাভাবিক নয়।
ভারতীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ধর্ম যাই হোক, তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। আমার দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো নাগরিক নেই। আমরা সংখ্যালঘু-সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বিভাজন মানি না।”
ভারতের জন্য জামায়াতের সম্ভাব্য জয় কী অর্থ বহন করতে পারে?
বিএনপির মতোই জামায়াতের বিরুদ্ধেও পাকিস্তানঘেঁষা অবস্থানের অভিযোগ আছে। তবে ড. মোহাম্মদ নকীবুর রহমান তা নাকচ করে বলেন, “জামায়াত একটি প্রো-বাংলাদেশ দল।”
তিনি যোগ করেন, “গত ৫৫ বছরে জামায়াত নেতৃত্বের কোনো বক্তব্য পাবেন না যেখানে পাকিস্তানপন্থী কোনো এজেন্ডা প্রচার করা হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক মনোযোগ বাংলাদেশ আর তার জাতীয় স্বার্থ।”
শফিকুর রহমানও বলেছেন, ভারত “অগ্রাধিকার” হিসেবেই থাকবে। “ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, এবং সেটাই অগ্রাধিকার থাকবে।”
যে ভারতকে এতদিন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে দেখা হতো, তারা এখন ঢাকায় কূটনৈতিক অবস্থান নতুন করে সাজাচ্ছে বলে জানা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াত নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগের চ্যানেল খোলা হয়েছে এবং চার দফা বৈঠক হয়েছে।
নকীবুর রহমান বলেন, “ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে জামায়াত প্রস্তুত। তবে আমরা মনে করি, সেই খোলামেলা মনোভাব সব সময় সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি।”
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের আগস্টে হার্ট সার্জারির পর এক জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিক শফিকুর রহমানকে দেখতে যান, কিন্তু “বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেন।”
নকীবুরের ভাষায়, “আমরা সেই অনুরোধকে অযৌক্তিক মনে করেছি। অন্য কূটনীতিকরা কোনো শর্ত ছাড়াই প্রকাশ্যে দেখা করেছেন। আমির সম্মান রেখেই জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের বৈঠক প্রকাশ্য না হলে তা অর্থবহ হবে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে জামায়াতঘেঁষা বা সমর্থক ব্যক্তিরা আছেন। এই বাস্তবতা এবং চলমান জনসমর্থনের ঢেউ জামায়াত ও তাদের জোটের পক্ষে কাজ করতে পারে।
এক সময় ছায়ায় থাকা জামায়াতে ইসলামী আজ ভোটের আগমুহূর্তে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। তারা ইতিহাসের সেরা ফলের আশা করছে। নির্বাচনে কী ফল হবে তা জানা যাবে ১৩ ফেব্রুয়ারি। তবে এটা পরিষ্কার—বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত এখন বড় একটি ফ্যাক্টর, এবং তাদের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।