উচ্চ আদালতের রায় পেয়েও বাবার মত মেয়রের চেয়ারে বসা হয়নি ইশরাক হোসেনের; এবার তিনি বাবার মত সংসদে যেতে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেন ঢাকা-৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি সামনে পাচ্ছেন যে পাঁচজনকে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল মান্নান।
ইশরাকের বাবা পুরান ঢাকায় এক সময়ের আলোচিত রাজনীতিবিদ সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন ঢাকার অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের সবশেষ মেয়র। এই মুক্তিযোদ্ধা চারবার এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন দুইবার।
বাবার সেই বণিল রাজনৈতিক পরিচিতি আর পুরান ঢাকার সন্তান পরিচয়কে সামনে রেখে নির্বাচনের তরী পার করার চেষ্টায় আছেন প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতোকোত্তর শেষ করে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইশরাক।
অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মান্নান জামায়াতের ঘরোয়া রাজনীতিতে পরিচিত হলেও ভোটের রাজনীতিতে নতুন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগরী পশ্চিম শাখা ও কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি।
পেশায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মান্নান ভোটের হিসাব কষছেন দল, জোট আর প্রতীকের জোরে। জামায়াত এ আসনে প্রার্থী দিয়েছে ২৯ বছর পর।
পুরনো ঢাকার ৩৪ এবং ৩৭ থেকে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৬ সংসদীয় আসন। সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, ওয়ারির পুরোটা এবং কোতোয়ালি ও বংশালের আংশিক এলাকা এ আসনে পড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে ভোটার আছেন ২ লাখ ৯২ হাজার ২৮৩ জন। তাদের মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ২ হাজার ৮৬৭ জন।
এ আসনের এমপি হতে ভোটের লড়াইয়ে আছেন গণ ফ্রন্টের আহম্মেদ আলী শেখ (মাছ), বাংলাদেশ কংগ্রেসের ইউনুস আলী আকন্দ (ডাব), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের আকতার হোসেন (হারিকেন) এবং জাতীয় পার্টির আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু (লাঙ্গল)।
এছাড়া গণ অধিকার পরিষদের (জিওপি) ফখরুল ইসলাম ট্রাক প্রতীক পেলেও ইশরাক হোসেনকে সমর্থন দিয়ে ভোট থেকে সড়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে নির্ধারিত সময়ের পর তার ওই ঘোষণা আসায় ব্যালটে তার প্রতীক থাকবে।
ভোটারদের প্রত্যাশা কী
সূত্রাপুরের ধূপখোলা মাঠের পাশের এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন নির্বাচন নিয়ে অত বেশি আশাবাদী নন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের ভোট দেওয়া না দেওয়া সমান। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, লাভ তাদের। আমাদের ঠিকই কর্ম করে চলতে হবে। গত ৫৪ বছরে আমাদের নিয়ে কেউ ভাবল না, সমস্যার কোনো সমাধান হল না, হবে বলেও মনে করি না।”
মাদক ‘ক্যান্সারের’ মত জেঁকে বসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এখন প্রধান সমস্যা মাদক। প্রকাশ্যে-গোপনে মাদক চলে। দেখার কেউ নাই, প্রতিবাদ করলে আপনি একা রাস্তায় চলতে পারবেন না। এইটা যদি কেউ ঠিক করে তাহলে জনগণের উপকার হবে।”
তাঁতীবাজার এলাকার শাখারীপট্টির বাসিন্দা শিলা রানি কর্মকার বললেন, “আমাদের নিরাপত্তা যে দেবে, ভোট তাকেই দেব। চুরি-ছিনতাই এ এলাকায় বেড়ে গেছে, এর জন্য দায়ী মাদক। ছোট ছোট ছেলেরা মাদক নিচ্ছে, বিক্রি করছে।
“নাগরিকদের জীবন রক্ষায় যে প্রার্থী কাজ করবে তাকে চাই। কোনো দলীয় পরিচয় দেখব না, যে কাজ করবে তাকেই ভোট দেব।”
ওয়ারীর টিপু সুলতান রোডের বাসিন্দা হারুন সরকারের কথাতেও রাজনীতিবিদদের নিয়ে অনাস্থার সুর পাওয়া গেল।
তিনি বললেন, “সংসদ সদস্য হওয়ার আগে কত কথাই তো সবাই বলে। কথার চোটে পারলে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেবে এলাকা। আসলে ঢাকার সংসদ সদস্যরা কিছু করে না, করার ক্ষমতাও নাই। সবতো সিটি কর্পোরেশন আর সরকার করে। মশা মারার ওষুধও সিটি কর্পোরেশন দেয়।
“তারপরও আমরা চাইব, আমাদের এলাকায় কোনো পার্ক নাই। পার্কের নামে যা আছে, তা হলো ছোট্ট এক টুকরা জমি ও কিছু গাছ। নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা নাই। দিনে ভবোঘুরে ও রাতে মাদকের আসর বসে। যানজট ও মাদকমুক্ত কতে পারলেই চলে।’’
গেণ্ডারিয়ার খালপার এলাকার ষাটোর্ধ্ব সোহরাব হোসেনের প্রত্যাশা, তার এলাকার সড়কগুলো আরেকটু প্রশস্ত হবে।
এক সময় সাদেক হোসেন খোকার ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত গোপিবাগ এলাকার রাইসুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খোকা ভাইয়ের ছেলে ইশরাক। বাপের ভোট তো পাইব, দেহা যাক নতুন ভোটাররা কারে দেয়। তাগো (তরুণ ভোটার) আনতে পারলে আগাইয়া যাইব। হ্যায়ও তো ইয়াং পোলা, ক্রেজ আছে।”
এ আসন ঘুরে দেখা গেল, নির্বাচনি প্রচারে মাইকের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী নিয়মিত ছোটো ছোটো পথসভা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন নয়ন বললেন, “মান্নান প্রথম ইলেকশন করতেছেন। নতুন হইলেও দলের কর্মীরা দিন-রাত খেটে ইমেজ দাঁড় করায়া ফেলেছে। সবার কাছে বারবার ছুটে যাচ্ছে। ইসলামপন্থি ভোট নিতে পারলে তারও সম্ভাবনা আছে।”
প্রচারে ব্যস্ত দুই প্রার্থী
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। ফলাফলে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগের ফজলে নূর তাপসকে।
সেই ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন ইশরাক। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ২০২৫ সালের মার্চে নির্বাচনের ফল বাতিল করে ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে আদালত।
রায় নিয়ে সিটি কর্পোরেশন অফিসে গেলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় শপথের ব্যবস্থা না করায় মেয়রের চেয়ারে আর বসা হয়নি ইশরাকের। সড়ক দখল করে আন্দোলন, সিটি করপোরেশন অবরুদ্ধ করেও লাভ হয়নি।
সেই ইশরাক এবার সংসদ নির্বাচনে জিততে বাবা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আনছেন ঘুরে ফিরে। ১১টি ওয়ার্ডে একদিন করে ১১ দিন বেছে নিয়ে সেই তালিকা ধরিয়ে দিয়েছেন দলের নেতা-কর্মীদের কাছে।
শনিবার ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ শেষে বিকেলে সায়দাবাদ টার্মিনালের করাতিটোলা অংশে প্রচার চালিয়ে দয়াগঞ্জ এলাকায় পথসভা করেন ইশরাক।
সেখানে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের সন্তান। দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই আপনাদের পাশে থাকব, ডাকলেই পাশে পাবেন।”
দয়াগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি পূরণে তিনি মন্দির স্থাপনের প্রতিশ্রতি দেন নির্বাচিত হলে।
বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকটের সমধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করে ইশরাক বলেন, “এটার সমাধান অবশ্যই করব। পাশাপাশি রাস্তা ঘাট মেরামত, ড্রেন পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা কমানোর প্রতিশ্রুতি আমরা দিচ্ছি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাব।’’
নির্বাচন বানচাল হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “যে কোনো মূল্যে একটি সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে আমাদের।”
নির্বাচন উপলক্ষে বসানো অস্থায়ী ক্যাম্প অফিসগুলোতে বিএনপির বিভিন্ন সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, ৩১ দফার কথা ও প্রতি মাসে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
জামায়াতের প্রার্থী মান্নান সেদিন সন্ধ্যায় পথসভা করেন ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের রাজধানী মার্কেটের পাশে দয়াগঞ্জে সিটি কর্পোরেশন পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য নির্মিত বহুতল আবাসিক এলাকায়।
সেখানে বসবাসরত হরিজন, তেলেগু, মানামি সম্প্রদায়ের জন্য আয়োজিত সভায় আব্দুল মান্নান বলেন, “রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যা কিছু আসবে তা সব আপনাদের কাছে পৌঁছে দেব। কেউ মেরে খেতে পারবে না আপনাদের হক। আমরা চাই, আপনাদের সন্তানরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হোক। আপনাদের আর ময়লার মধ্যেই রাখতে চাই না।”
জামায়াতের পার্থী প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার কোনো দোকান বা টং ঘর থেকে ‘চাঁদাবাজি’ করতে দেওয়া হবে না।
“কারো হক নষ্ট করতে দেওয়া হবে না, কারো প্রতি জুলুম হবে না। দাঁড়িপাল্লাকে জেতালে সব ধর্মের লোক নিয়ে আমরা সহঅবস্থানে থাকব।”
বুড়িগঙ্গা পরিষ্কার রাখা, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, যানজট দূর করা, শিশু-পুরুষ-নারী ও কর্মজীবীদের সুরক্ষা, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত পুরাণ ঢাকা এবং পার্ক প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা।