বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের দুঃখ ও দাবি— ফেনী নদীতে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। আল্লাহ যদি আমাদের সে সুযোগ দেন, আমরা জানি, পার্শ্ববর্তী আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এ ব্যাপারে কিছু বিষয় আছে। আমরা তাদেরকে শ্রদ্ধা করি, আশা করি তারাও আমাদেরকে শ্রদ্ধা করবেন এবং তাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপের মাধ্যমে আমরা এর শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করব, ইনশাআল্লাহ।
আজ শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টায় ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা একটি ৩৬ জুলাই পেয়েছিলাম, এজন্য সবাই এখানে আসতে পেরেছি। ৩৬ জুলাইয়ের আগে এ ধরনের একটি দৃশ্য আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। গোটা দেশ ছোপ ছোপ রক্ত আর হাড়ে-হাড়ে লাশে ভরে গিয়েছিল। সেই যে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এরা তাদের খুনের তাণ্ডব শুরু করেছিল— ক্ষমতায় এসে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকে হত্যা, বিএনপির নেতৃবৃন্দকে হত্যা, আলেম-ওলামাকে হত্যা, সাংবাদিকদের হত্যা, সিভিল সোসাইটির সদস্যদের হত্যা— যাকে ইচ্ছা হয়েছে তাকেই খুন করার মাধ্যমে খুনের রাজত্ব তারা শুরু করে।
তিনি বলেন, ফেনীবাসী, আপনারা ছিলেন আরও বেশি সন্ত্রাসের রাজ্যে এবং বংশানুক্রমিক সন্ত্রাসের মধ্যে। এটি অন্য কোনো জেলায় খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও আপনারা প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। সন্ত্রাসীদের লাল চশমাকে পরোয়া করেননি। আপনারা এবং আপনাদের বুকের সন্তানরা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। পুরো জুলাইজুড়ে আন্দোলন করেছেন। আগস্টের ৫ তারিখ ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। এখানে মহিপালে ১২ জন আমাদের সহযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেছেন। আমি তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। মহান রবের দরবারে দোয়া করছি—আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মর্যাদাবান শহীদ হিসেবে কবুল করুন।
‘আমি আরও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি পিতৃভূমি ফেনীর মানুষ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। আধিপত্যবাদকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। এই জায়গায় আমরা তাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শুকরিয়া ও অভিনন্দন জানাই।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সবচেয়ে দুর্ভোগকালীন কঠিন সময়ে যিনি কেন্দ্রীয় আমিরের দায়িত্ব পালন করেছেন—আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয়, আপনাদের অনেকের শিক্ষক জনাব মকবুল আহমেদ সাহেবকে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রুহের প্রতি সীমাহীন রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। আমিন।’
‘সম্মানিত ফেনীবাসী, আপনাদের অনেক সমস্যা আছে। দু-একটি সমস্যার স্বচক্ষে সাক্ষী হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পরপরই সম্ভবত ১২ আগস্ট সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে গোটা ফেনী জেলা সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লার একটি অংশও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘সেই সময় প্রথম দিনই ঝুঁকি নিয়ে আমরা এসেছিলাম। গাড়ি চলেনি। আমরা হেলিকপ্টারে দ্রুত আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার কর্তৃপক্ষ বলেছিল—এই আবহাওয়ায় উড্ডয়ন সম্ভব নয়। বলা হয়েছিল, আপনি আসবেন না, কারণ ফেনী পর্যন্ত পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। জায়গায় জায়গায় হাঁটু পানি, কোমর পানি। আমি বললাম— মানুষ কি কিছু চলাচল করছে? কীভাবে করছে? বলল, কোমর পানি ভেঙে করছে। আমি বললাম, আমিও কোমর পানি ভাঙব। এবং চেষ্টা করলাম আপনাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর।’
‘সেদিন আপনাদের দুঃখ-দুর্দশা শুধু দেখেছি, আর সেই কষ্ট দেখে একটুখানি চোখের পানি ফেলেছি। ওই কয়েক ফোঁটা পানি বন্যার পানির সঙ্গে মিলিয়ে গেছে। আমি আসিনি আপনাদের সব দুঃখ-দুর্দশা শেষ করতে। এসেছিলাম আপনাদের দুঃখের সঙ্গী ও সাক্ষী হতে। এরপর অনুকূল পরিবেশ এলে ভাঙা বাঁধের জায়গাটি দেখতে এসেছিলাম। ছোট্ট একটি জায়গা—কিন্তু এটি মর্যাদার প্রশ্ন, এটি আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আজ আমার খুব মনে পড়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এই ফেনী নদী নিয়ে দুটি কথা বলার জন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে। ফেনীবাসী, আবরার ফাহাদের রুহকে আপনাদের কাছে রেখে গেলাম। যতদিন ফেনী দুনিয়ায় বেঁচে থাকবে, অনুরোধ থাকবে—আপনারা আবরার ফাহাদকে আপনাদের কলিজায়, হৃদয়ে একটু জায়গা করে দেবেন। সে আপনাদের কথা বলেছিল, দেশের ন্যায্য প্রাপ্যতার কথা বলেছিল। এজন্য আধিপত্যবাদের দোসর ও দালালরা তাকে সহ্য করতে পারেনি।’
‘মহান রবের দরবারে দোয়া করি—হে আল্লাহ, তুমি আবরার ফাহাদকে হাক্কানি শহীদ হিসেবে কবুল করো। আমিন। তার কবরের সঙ্গে তোমার প্রিয় জান্নাতের একটি জানালা খুলে দাও। আরও ১২ জন শহীদের কবরগুলো তোমার জান্নাতি নূরে প্লাবিত করে দাও। আমিন। তাদের সকলের আপনজনের অন্তরে তুমি প্রশান্তি নাজিল করো।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখানে লালপুলে একটি ওভারপাস হওয়া দরকার। এটি বড় কোনো দাবি নয়। ফেনীতে একসময় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছিল—পরে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ঘোষণা দিয়েছি, ১৮ কোটি মানুষের দেশে ৬৪ জেলার কোনো জেলা মেডিকেল কলেজ থেকে বঞ্চিত হবে না, ইনশাআল্লাহ। এটি হবে সরকারি মেডিকেল কলেজ। এর পাশাপাশি প্রত্যেক জেলা সদর দপ্তরে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘ফেনীতে মানসম্মত একটি স্টেডিয়াম নেই। ফেনী একটি সমৃদ্ধ জেলা। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের খেলার ভেন্যুতে রূপান্তর করা হবে, ইনশাআল্লাহ। এরকম আরও বহু সমস্যা আছে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবগুলোর সমাধান আমরা করব, ইনশাআল্লাহ।’