ফেসবুকে একটি ‘ভোটার সম্মানি রশিদ’ এর ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী লায়ন আসলাম চৌধুরী ও ধানের শীষের প্রতীকের ছবিযুক্ত রশিদে এক নারীর বিকাশ এজেন্ট নম্বর ও ভোটার আইডি কার্ড নম্বর দেয়া রয়েছে। এই রশিদের সূত্র ধরে একাধিক ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রাম–৪ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আসলাম চৌধুরী রশিদ ছাপিয়ে ভোটারদের টাকা দিচ্ছেন।
তবে দ্য ডিসেন্ট-এর যাচাইয়ে ভাইরাল হওয়া রশিদটিতে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে যার প্রেক্ষিতে এটিকে ভুয়া বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।
রশিদটিতে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারির জাহানাবাদ গ্রামের ‘সাহেদা বেগম’ নামের একজন নারীর একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর এবং একটি বিকাশ এজেন্ট নম্বর উল্লেখ রয়েছে।
তবে উল্লিখিত এনআইডি নম্বরটি আংশিকভাবে নীল কালিতে ঢেকে দেওয়া। দৃশ্যমান অংশ বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, ঢেকে রাখা অংশে এক বা দুইটি ডিজিট থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এনাইডির নম্বরটি ১৪ বা ১৫ ডিজিটের।
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে এনআইডি কার্ডের নম্বরে ১৪ বা ১৫ ডিজিটের সংখ্যা হয় না।
নির্বাচন কমিশনের একটি ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “২০০৭/২০০৮ সালে যারা ভোটার হয়েছিল, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৩ ডিজিটের প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তাতে জন্মসাল যুক্ত করে ১৭ ডিজিট করা হয়। স্মার্ট কার্ড প্রদান করা শুরু হলে সবার এনআইডি নম্বর ইউনিক নম্বর ১০ ডিজিটে প্রদান করা হয়। যারা স্মার্ট কার্ড পাননি বা নতুন ভোটার, তাদেরও ১০ ডিজিটের নম্বর দেওয়া হচ্ছে।”
অর্থাৎ, বাংলাদেশের এনআইডি কার্ডে প্রদানকৃত নম্বরটি ১০ ডিজিট, ১৩ ডিজিট বা ১৭ ডিজিটের হয়ে থাকে।
এছাড়া, রশিদে উল্লেখিত বিকাশ ‘এজেন্ট’ নম্বরটিও যাচাই করে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। রশিদে দেখানো বিকাশ নম্বরে একটি সংখ্যা ঢেকে দেওয়ায় সংখ্যাটি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্য ডিসেন্ট ঢেকে দেওয়া সংখ্যায় ০ থেকে ৯ পর্যন্ত সংখ্যা বসিয়ে বিকাশ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে উক্ত ’ ‘এজেন্ট’ নম্বরে ক্যাশআউট করার চেষ্টা করলে প্রতিটি ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা এসেছে, “এই নম্বরটি লেনদেনের জন্য উপযুক্ত নয়। অনুগ্রহ করে সঠিক নম্বর দিন।”
অর্থাৎ, প্রচারিত ছবিতে দেওয়া বিকাশ নম্বরে কোনো ‘এজেন্ট’ অ্যাকাউন্ট খোলা নেই।
অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফোন নম্বরটির ঢেকে দেয়া ডিজিটে ০ থেকে ৯ বসিয়ে সংশ্লিষ্ট নম্বরগুলোতে কল করেও সাহেদা বেগমকে পাওয়া যায়নি। ৯টি সম্ভাব্য ফোন নম্বরের মধ্যে ৫টি বন্ধ পাওয়া গেছে, তিনটি নম্বরে যোগাযোগ করা ব্যক্তিরা সাহেদা বেগম নামে কাউকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন এবং একটি নম্বরে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ছবিটি অনুসন্ধান করে দেখা যায়, একটি ছবিই বিভিন্ন পোস্টে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভিন্ন কোণ থেকে তোলা অন্য কোনো ছবি, ভিডিও বা সরাসরি লেনদেনের অন্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়াও, কী–ওয়ার্ড সার্চেও এ সংক্রান্ত অন্য কোন খবর, সূত্র বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যা তার প্রেস উইং কর্মকর্তা আবু তাহেরের নামে প্রচারিত।
বিবৃতিতে বলা হয়, “সম্প্রতি ‘ভোটার সম্মানি রশিদ’ নাম দিয়ে একটি এআই কিংবা ফটোশপ–জেনারেটেড স্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে একটি মহল, যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আসলাম চৌধুরীর মতো জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতাকে টাকা দিয়ে ভোট নিতে হবে না। দেশের সাধারণ মানুষ মাত্রই এই অপপ্রচার ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।”
আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনী মিডিয়া টিমের সদস্য মোহাম্মদ আবু তাহের দৈনিক মানবজমিনকে বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি পক্ষ গুজব ছড়াচ্ছে। তারা এআই দিয়ে ছবি তৈরি করে নোংরামি করছে। আসলাম চৌধুরীর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে এরকম ফেক আইডি দিয়ে নোংরামি করছে বট বাহিনী।
ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট মোহাম্মদ মোরছালিন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফেসবুকে ‘Md Ah Rakib’ নামীয় আইডিসহ একাধিক ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘ভোটার সম্মানি রশিদ’ নামে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন স্লিপ প্রচার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আবেদনে এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার জন্য নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেও এই ধরনের কোন রশিদের মাধ্যমে টাকা বিতরণের তথ্যে সত্যতা পাওয়া যায়নি।
দৈনিক আমাদের সময়ের সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি রায়হান উদ্দিন দ্য ডিসেন্ট-কে বলেছেন, “আমি স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের কোনো রশিদের বাস্তব প্রমাণ পাইনি। কেউ এ ধরনের রশিদ সম্পর্কে অবগত নয়।”