বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বহু মানুষের ‘জান কুরবানির বিনিময়ে’ আমাদের দেশে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের ধারা ধরে রাখতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাতে রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এই কথা বলেন।
এ সময় তিনি আশ্বাস দেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে রাজধানীর উত্তরা এলাকার গ্যাস, পানি, চিকিৎসা, জলাবদ্ধতা, যানজটসহ সাত সমস্যা সমাধান করবে।
ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুর হয়ে উত্তরার আজমপুরের ঈদগাহ মাঠে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ৫২ মিনিটে মঞ্চে উঠেন তারেক রহমান। পরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন তিনি। বক্তব্য শেষে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুন-গুমের শিকার হওয়া পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে স্বাক্ষাৎ করেন। এরপর রাত ১টা ১৭ মিনিটে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিলম্বের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘সকালে ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম। সেখানে থেকে গাজীপুর হয়ে মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে আসতে আসতে এত দেরি হয়ে গেল। এ জন্য আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি এই এলাকার মানুষের কিছু সমস্যা আমি জানি। এরই মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে, আপনারা প্রতি মাসে বিল দেন, কিন্তু গ্যাস ঠিকভাবে আপনারা পান না। এই সমস্যা শুধু এই এলাকার না, সারা দেশের। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি—কোনভাবেই নতুন গ্যাস কূপের সন্ধান করতে দেওয়া হয় নি। এই সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে আমদেরকে নতুন মিল, ফ্যাক্টরি, কলকারখানা করতে হবে। যাতে করে আমাদের দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এই এলাকার মানুষের, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের একটি দাবি হল হাসপাতাল। সঠিক চিকিৎসার জন্য একটি সরকারী হাসপাতাল প্রয়োজন। ইনশাল্লাহ ধানের শীষ বিজয়ী হলে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি সমস্যা, যেটি শুধু এই এলাকার মানুষের না, সারা বাংলাদেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে—সেই সমস্যা হচ্ছে, পানি সংকট। বিল দেয়, কিন্তু পানি সঠিকভাবে পায় না। কারণ, আমাদের দেশে খাল বিল শুকিয়ে গেছে। আমাদের নদীর প্রবাহগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই এলাকাসহ সারা দেশের পানির সমস্যা দূর করতে হবে। এই জন্য আমরা খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। শুধু এই এলাকার পানি সমস্যার সমাধান নয়, চেষ্টা করবো সারা দেশের পানির সমস্যার সমাধান করতে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘সামনে কয় দিন পরে বর্ষা মৌসুম শুরু হবে। এই বর্ষা মৌসুম যখন শুরু হয়, তখন এই এলাকার মানুষের সব চেয়ে বড় দুর্ভোগ হয় জলাবদ্ধতা। একালার ভেতরে ভেতরে অনেকগুলো রাস্তা আছে, যেগুলো পানির নিচে চলে যায়। এই জলাবদ্ধতা এই এলাকাসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায়। ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখে বিএনপি সরকার গঠন করলে, আপনারা এখান থেকে ধানের শীষকে বিজয়ী করলে নিয়ে আসলে জলাবদ্ধতার সমস্যা সব থেকে আগে দূর করা হবে। যাতে মানুষ চলাচলটা সঠিকভাবে করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এই এলাকার আরেকটি সমস্যা হল যানজট। যানজট শুধু এই এলাকা নয়, সারা ঢাকা শহরের। কিভাবে যানজটকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এ ব্যাপারে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। যেহেতু অনেক দেরী হয়ে গেছে, সেহেতু আমি বিস্তারিত বলবো না।’
তারেক বলেন, ‘মাদকের বিশাল সমস্যা রয়ে গেছে এই এলাকায়। এই সমস্যা একটি ভয়ঙ্কর সমস্যা। যিনি সমস্যা পড়েন, পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমাদেরকে যেকোন মূল্যে এই এলাকাসহ দেশের মানুষকে বের করে নিয়ে আসতে হবে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই এলাকাসহ সারা বাংলাদেশে অল্প শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত তরুণ আছে, যুবক আছে, যাদের কর্মসংস্থান নেই। আমাদের তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যদি চলন্তের জন্য, জীবন্তের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে পারব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা যদি সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি, আমরা যদি বন্ধনটা সুসংগত করতে পারি তাহলে আমরা বাংলাদেশের এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারব। সেখানে আপনাদের (জনগণ), উত্তরার মানুষ জুলাই আন্দোলনকে সফল করেছিলেন, ঠিক একইভাবে যদি বাংলাদেশের মানুষ, গণতন্ত্রের মানুষ, উত্তরার মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে, একত্রিত থাকে ইনশাআল্লাহ আমরা ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে এই সকল সমস্যা থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারব।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের এই মঞ্চের পাশে আরেকটি ছোট মঞ্চ আছে। যেখানে দুর্দিনে এলাকার মানুষদের মধ্যে যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের স্বজনরা এখানে আছেন। কিন্তু এই মানুষগুলো কেন আজকে স্বজন হারা? যার স্বাক্ষী আপনারা উপস্থিত আছেন।’
বিগত ১৬/১৭ বছর ধরে দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, কথা বলার অধিকারসহ সব রকম অধিকারকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই অধিকারের পক্ষে কথা বলতে গিয়েই, এই মানুষগুলো তাদের স্বজনদের হারিয়েছেন—বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট যে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছিল, এই উত্তরার মানুষ সেটিকে সফল করেছিল অনেকাংশে। এই যে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, সেখানে উত্তরার মানুষকের বিশাল একটি অবদান রয়েছে। ইনশাআল্লাহ, সেই অবদানের কথা আগামী দিনের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।’
দেশের পরিবর্তনের ধারার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘৫ আগস্ট দেশে একটি পরিবর্তন এসেছে। বহু ত্যাগ, বহু তিতিক্ষা, বহু জান কুরবানির বিনিময়ে এই পরিবর্তন এসেছে। আমাদের এই পরিবর্তনের ধারাটি ধরে রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তনের ধারা হচ্ছে, দেশে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, মানুষের কথা বলার অধিকারকে তৈরি করতে হবে, মানুষের ভোটের অধিকারকে শক্তিরূপে স্থাপন করতে হবে। যাতে করে আগামীতে আর কোন স্বৈরাচার না এসে মানুষের রাজনৈতিক অধিকারসহ সকল নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। এবং এই দায়িত্ব উত্তরাসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ যদি সজাগ থাকে, তাহলে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।’
‘আজ রাত অনেক হয়েছে। আপনারা গত ৬/৭ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। কাজেই বক্তব্য দীর্ঘায়ত করব না। সামনে ১২ তারিখ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে আজকে একদল আরেক দলকে বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য করছেন। এসব বাদ দিয়ে আমাদের ঠান্ডা মাথায় চিন্তা ভাবনে করতে হবে, কি কি কাজ করলে জনগণের কষ্ট লাঘব হবে’—বলেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘উত্তরা, ঢাকা মহানগরসহ সারা বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষের সমস্যার সমাধান একটু হলেও কিভাবে লাঘব করা সম্ভব হয়, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে, চিন্তা ভাবনা করতে হবে এবং সেগুলো আমাদের বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।’
শীর্ষনিউজ