আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে মাঠে নেমেছে দেশের মাজারপন্থি ও সুফিবাদী দলগুলো। ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দরবারভিত্তিক তিনটি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’। কওমি ও মওদুদী মতাদর্শের বিপরীতে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’-এর অনুসারী এই জোটটি ইতোমধ্যে ৭০টি আসনে তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে।
জোটের গঠন ও শীর্ষ নেতৃত্ব
গত ৩০ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি (একতারা)—এই তিনটি নিবন্ধিত দলের সমন্বয়ে বৃহত্তর সুন্নি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। জোটের নেতারা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ১২ হাজার দরবারের অনুসারীরা এই প্ল্যাটফর্মের পক্ষে কাজ করবেন।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা ও আসন বণ্টন ঘোষণা করার কথা থাকলেও তারা তা করেনি।
হেভিওয়েট প্রার্থী ও আসন বণ্টন
জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ৭০টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট লড়বে ২৫টিতে, বিএসপি ২৫টিতে এবং ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ লড়বে ২০টি আসনে।
শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আলোচিত বক্তা মুফতি গিয়াস উদ্দিন আত্ব-তাহেরী লড়বেন হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসন থেকে। অপরদিকে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ইসলামিক ফ্রন্টের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন নির্বাচন করবেন চট্টগ্রাম-৯ (সিটি করপোরেশনের একাংশ) থেকে। আর বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন মাইজভাণ্ডারী নির্বাচন করবেন চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভোট ব্যাংক
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে দরবারভিত্তিক দলগুলোর বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সমর্থক ছিল। তবে এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই জোটটি একটি বড় ভোট ব্যাংক নিজেদের দিকে টানতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিন দলের একাধিক নেতা জানান, বিগত দিনে তারা বড় দলগুলোকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাদের আদর্শিক কোনও স্বার্থ হাসিল হয়নি। বরং অবহেলার শিকার হয়েছেন। তাই এবার নিজেদের ভোট নিজেরা যাচাই করতে ‘এক বাক্স’ নীতি অবলম্বন করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম রাব্বানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই দলগুলো মূলত আওয়ামী ঘরানার। অতীতে তারা নির্বাচন করলেও তেমন সুফল পায়নি। তবে এবার যেহেতু তারা জোট করেছে এবং আওয়ামী লীগও ভোটে নেই, তাই তারা কিছুটা সুবিধা পেতে পারে। এখন হয়তো আওয়ামী লীগ বলছে নির্বাচনি মাঠে থাকবে না। কিন্তু ভোটের আগের দিনও যদি দলটি এই জোটকে সমর্থন দিয়ে দেয়, তাহলে একটি বা দুটি আসনে তারা জিতেও যেতে পারে। একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমার ধারণা তারা আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোট টানতে পারে।”
তিন দলের নেতৃত্বে কারা ও দলীয় শক্তি
‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ মূলত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বিদায় বিশ্বাসী এবং বিভিন্ন মাজার ও দরবার সংশ্লিষ্ট দলগুলোর একটি ঐক্য। এই জোটের মূল শক্তি ও নেতৃত্বের বিন্যাস হলো—
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ: এই দলের প্রতীক চেয়ার। দলের চেয়ারম্যান হলেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ আবেদীয়া মোজাদ্দেদীয়া দরবার শরীফের পীর সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী এবং মহাসচিব আবুল বাশার মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন জুবাইর। চাঁদপুরে তাদের প্রচুর ভক্ত-অনুরাগী আছেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় দলটির শক্তিশালী ভোট ব্যাংক রয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি): একতারা প্রতীক নিয়ে লড়বে এই দল। এর নেতৃত্বে আছেন সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী (চেয়ারম্যান) ও মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল আজিজ সরকার (মহাসচিব)। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি মাইজভাণ্ডারী দরবারের অনুসারীদের প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এটি। অতীতে দলগতভাবে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। সারা দেশেই দরবারটির বিপুল মুরিদ ও ভক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট: এই দলের প্রতীক মোমবাতি। এর চেয়ারম্যান মাওলানা এম এ মতিন এবং মহাসচিব অধ্যক্ষ স উ ম আব্দুস সামাদ। মূলত চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও খুলনার উপকূলীয় এলাকায় দলটির নিজস্ব জনভিত্তি রয়েছে।
নেতারা যা বলছেন
জোটের নেতারা বলছেন, তারা আর কোনও বড় দলের ‘সিঁড়ি’ হতে চান না। বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) অতিরিক্ত মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিগত দিনে বড় দলগুলো আমাদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় গেলেও আমাদের মূল্যায়ন করেনি। তাই এবার আমরা নিজেদের শক্তি যাচাইয়ে ‘এক বাক্স’ নীতিতে ভোট করবো।”
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ১২ হাজার দরবারের মুরিদ ও ভক্তরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবার অনেক আসনেই সুন্নি জোটের জয় নিশ্চিত হবে।
নিজেদের জুলাইয়ের শক্তি দাবি করে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শুধু আওয়ামী লীগের ভোট আমরা পাবো, তা সঠিক নয়। বরং দেশের ইসলামি মূল্যবোধ ও সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী সব মানুষই আমাদের বেছে নেবে।” সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এই জোট চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও খুলনার কয়েকটি আসনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।