ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার আছিম বাজার এলাকার এক সংগ্রামী মায়ের জীবনগাথা এখন অনেকের অনুপ্রেরণা। দারিদ্র্য, অভাব আর নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলেছেন দেশসেবায় নিয়োজিত চারজন প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালের রোকেয়া দিবসে ‘সফল জননী’ ক্যাটাগরিতে ময়মনসিংহ জেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে আদরিনী সরকার পেয়েছেন ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মাননা।
শৈশবে বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে প্রতিদিন নদী সাঁতরে স্কুলে যেতেন আদরিনী। ১৯৭৭ সালে মেট্রিক পাস করার পর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে সে বছরই বেকার যুবকের সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখেন, একটি ছোট ঘরে আট ভাই-সহ শ্বশুর-শ্বাশুড়ির বিশাল সংসার। সীমাহীন অভাবের মধ্যেই তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়। জীবনের শুরুতেই প্রথম সন্তানের মৃত্যু তাকে ভেঙে দিলেও দমে যাননি তিনি।
বছর না পেরোতেই একান্নবর্তী পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। এরপর একে একে চার সন্তানের জন্ম। এরই মাঝে ঘটলো বড় বিপর্যয়—স্বামীর পরিবারের ৭ ভাই শ্বশুর-শ্বাশুড়ির ভিটেমাটি, জমিজমা সব বিক্রি করে একসময় ভারতে চলে যায়। বাধ্য হয়ে বাজারে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু হয়। দেশে পড়ে থাকে শুধু আদরিনী, তার স্বামী ও চার সন্তান।
আদরিনী সংসার চালাতে হাঁস-মুরগি পালন করতেন, কোচিংয়ে বিনা বেতনে পড়াতেন, আবার এক জুনিয়র হাইস্কুলে কোনো বেতন না পেয়েই শিক্ষকতা করতেন। যেন সন্তানদের বেতন না দিতে হয়। প্রতিদিন ৪ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতেন। কখনো নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাইয়ে দিয়েছেন। পল্লী চিকিৎসার কাজ শিখে টানাপোড়েনের সময় সামাল দিয়েছেন একাই। অবশেষে তিনি সফল। তার অসীম সাহস ও আত্মত্যাগে গড়ে উঠেছে চারটি রত্নসন্তান।
বড় ছেলে উত্তম কুমার সরকার রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে ৩৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে জামালপুর মেডিকেল কলেজ সদর হাসপাতালের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
ছোট ছেলে উজ্জ্বল কুমার সরকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে ৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বড় মেয়ে সুবর্ণা সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন, তিনি ৪৩তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ আছেন।
ছোট মেয়ে প্রতিমা সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে এনটিভিতে কর্মরত আছেন।
এতো চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও পড়াশোনার ইচ্ছে ছিল তার। এই সংগ্রামী মা নিজে ১৯৮৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষাও দিয়েছিলেন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। কম টাকায় পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। তাদের অনেকেই বিনা বেতনে পড়িয়েছেন, অনেকে কম টাকাতেও পড়িয়েছেন। আজ তিনি অসুস্থ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। কিন্তু মায়ের সেই হাসিমাখা মুখ আবার দেখতে চান সন্তানেরা। তারা চান, ‘রত্নগর্ভা মা’ পুরস্কার পেয়ে অন্তত একবার বিজয়ের আনন্দে মুখ ভরে হাসুন তাদের মা। এই মা শুধু একজন সফল জননী নন, তিনি বাংলার প্রতিটি সংগ্রামী মায়ের প্রতিচ্ছবি।
রত্নগর্ভা মা আদরিনী সরকার বলেন, 'আমার জীবনে পাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। একটা সময় পড়াশোনার ইচ্ছে ছিল খুব, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা করা হয়ে উঠেনি। ছিল শুধু সন্তানদের জন্য বাঁচার ইচ্ছা। অনেক দিন না খেয়ে থেকেছি, অনেক রাত কেঁদেছি, কিন্তু কখনো সন্তানদের সামনে দুর্বল হতে দিইনি। আমি চাইনি তারা আমার কষ্ট দেখুক। আমি শুধু চেয়েছি তারা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হোক, দেশের কাজে লাগুক। আজ যখন দেখি তারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মনে হয় আমার সব কষ্ট সার্থক। এর চেয়ে বড় পাওয়া একজন মায়ের আর কিছু হতে পারে না।'
তার বড় কন্যা সুবর্ণা সরকার বলেন, 'আমাদের মায়ের জীবনের গল্পটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তিনি আমাদের কখনো বিলাসিতা শেখাননি, শিখিয়েছেন ধৈর্য আর দায়িত্ববোধ। নিজের স্বপ্ন ভেঙে তিনি আমাদের স্বপ্ন গড়ে দিয়েছেন। আজ আমরা যে যেখানে আছি, তার পেছনে মায়ের নিঃশব্দ ত্যাগ আর অদম্য সাহসই সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা চাই, মা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পাক।'