দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড ধারণাটি নতুন নয়। তবে সময় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভেদে এর লক্ষ্য, কাঠামো ও বাস্তবায়ন কৌশলে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চালু হওয়া ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ ছিল টিসিবিার স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য বিতরণকেন্দ্রিক একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোগ্যপণ্য ভর্তুকি মূল্যে কেনার সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিএনপির প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ মূলত নগদ সহায়তা কিংবা সমপরিমাণ খাদ্যপণ্য দেওয়ার একটি সামাজিক সাপোর্ট মডেল। যেখানে নারীকে কেন্দ্র করে পরিবারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার কথা বলা হচ্ছে। উদ্দেশ্যে মিল থাকলেও সুবিধার ধরন, ভুক্তেভোগী নির্বাচন, মেয়াদ ও অর্থনৈতিক দর্শনে এই দুই কার্ডের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
নিম্ন আয়ের এক কোটি পরিবারের জন্য ২০২৩ সালে ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এই কার্ডধারীরা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দেয়া স্বল্পমূল্যে পণ্য কেনার সুবিধা পান। টিসিবির পণ্য কেনার জন্য একটি পরিবারকে আগে সাধারণ কাগুজে কার্ড দেওয়া হতো। পরে পুরোনো এই কার্ড বাতিল করে স্মার্ট কার্ডের বিপরীতে পণ্য বিতরণ শুরু করে টিসিবি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেয়া স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ অনিয়ম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নানা যাচাই-বাছাই শেষে ৪৩ লাখ কার্ডধারীকে বাদ দিয়ে বাকি ৫৭ লাখ পরিবারের মধ্যে স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে। তখন স্মার্ট কার্ড বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, পুরোনো কাগুজে পরিবার কার্ড এখন থেকে বাতিল। একমাত্র নতুন স্মার্ট কার্ডেই এখন থেকে টিসিবির বিপণন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, সাবেক সরকারের সময়ে টিসিবির কার্ড বিতরণে যে নৈরাজ্য ও দুর্বৃত্তায়ন হয়েছিল, তা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। এর অংশ হিসেবে স্মার্টকার্ড তৈরি ও বিতরণ করা হচ্ছে। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘আমরা মোট ৬৩ লাখ স্মার্টকার্ড প্রস্তুত করেছি। ফলে আরও ৩৫–৪০ লাখের মতো কার্ড নতুন করে বিতরণ করতে পারব।’
টিসিবির মুখপাত্র ও উপপরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. শাহাদত হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এখন পর্যন্ত দেশে ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার পরিবারকে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হয়েছে। তবে আবেদন প্রক্রিয়া চলমান, তাই এই সংখ্যা আরও বাড়বে। স্বচ্ছতার সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যদের এই কার্ড প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ফ্যামিলি কার্ডের ফ্রেমটা তৈরি হলেও সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আমরা একটা কমিটমেন্ট দিচ্ছি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে তখন ঠিক করা হবে, এই কার্ডের আর্থিক যোগান কোথা থেকে আসবে এবং বিতরণ কীভাবে হবে। আমরা এই কমিটমেন্ট নিয়েই জনগণের কাছে যাচ্ছি - সেলিমা রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
বর্তমানে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারী একজন সুবিধাভুগী মাসে একবার টিসিবি থেকে কম দামে সর্বোচ্চ দুই লিটার ভোজ্যতেল (সয়াবিন বা কুঁড়ার তেল), দুই কেজি মসুর ডাল ও এক কেজি চিনি কিনতে পারছেন। পাশাপাশি কার্ডধারী একটি পরিবার ৩০ টাকা কেজিতে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি চাল কিনতে পারেন। আর গত নভেম্বর থেকে টিসিবির পণ্যতালিকায় যুক্ত হয়েছে চা, লবণ, ডিটারজেন্ট ও দুই ধরনের সাবান। তবে বিভিন্ন সময় পণ্যের দাম বাড়লে সেগুলোও এই তালিকায় যুক্ত করা হয়। দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোপূর্বে পেঁয়াজ, আলু কিংবা গত রমজানে খেজুরও বিক্রি করেছে টিসিবি।
এদিকে নির্বাচনের আগে দেশে ফেরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, তাদের দল সরকার গঠন করলে প্রয়োজন অনুসারে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবে। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, তাদেরকে ঘিরে একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটি ফ্যামিলি কার্ড। এটা এমন না যে একবার কার্ড পেলে সারা জীবন পাবে। মূলত পাঁচ থেকে সাত বছর আমরা একটা পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করবো। সেটা টাকার হিসেবে হতে পারে অথবা অতিপ্রয়োজনীয় খাবার আইটেমের হিসেবে হতে পারে। কারণ আমরা দেখেছি যে একজন নারীকে যদি সাপোর্ট দেওয়া হয়, সে তার ফ্যামিলির জন্য সঠিক ভাবে খরচ করবেন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা রিসার্চ করে দেখেছি যে যদি ৫-৭ বছর যদি সাপোর্ট দেওয়া যায়, তাহলে যে অর্থটা তার হাতে জমা হয় সেটি মূলত তিনটি কাজে খরচ করে। প্রথমত, তার পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যের পেছনে। দ্বিতীয়ত, তার ছেলেমেয়েদের শিক্ষার পেছনে। তৃতীয়ত, জমা করা অর্থ বিভিন্নক্ষেত্রে ছোট ছোট বিনিয়োগ করে। এইভাবে যখন সে বিনিয়োগ করা শুরু হবে, স্বাভাবিকভাবে তার গ্রামের স্থানীয় অর্থনীতি উন্নত হবে, পরে তার উপজেলার অর্থনীতি, জেলার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। এভাবে পরিবারটা শিক্ষিত হবে, পরিবারের সদস্যের স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে একসময় পুরো গ্রামটা, উপজেলাটা, জেলা, বিভাগ এবং দেশটা উন্নত হবে।
ধারাবাহিকভাবে চার কোটি পরিবারের মধ্যে এই কার্ড দেয়া হবে জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, চার কোটি ফ্যামিলির মধ্যে একবারে দেওয়া সম্ভব না, গ্রাজুয়ালি আমরা যাবো। প্রান্তিক ও চাহিদাসম্পন্ন ও নিন্ম আয়ের পরিবারকে দিয়ে আমরা শুরু করবো। এই কার্ডটি জেনারেল থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে বিভিন্ন ক্যাটাগরি করা হয় এবং সেখানে দুর্নীতি দেখা দেয়। সেজন্য আমরা এটি জেনারেল রেখেছি। এটি যেমন একজন গ্রামের কৃষকের স্ত্রী পাবেন, তেমন ইমাম সাহেব, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের স্ত্রী, একইভাবে ডিসি, এসপি হিসেবে স্ত্রীরাও পাবেন। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ডিসি বা এসপির স্ত্রীরা নিশ্চয়ই এই কার্ড নিবেন না, কারণ উনাদের ওটি প্রয়োজন হবে না।
বিএনপির এই ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে এই কার্ডপ্রাপ্তরা ঠিক কী কী সুবিধা পাবেন বা কত ধাপে কীভাবে দেয়া হবে সেসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও বিএনপির অফিশিয়াল ফেসবুকে পেজে ভিডিও প্রচারণায় বলা হয়েছে, প্রতিটি ফ্যামিলি কার্ডে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেয়া হবে। দলটি থেকে মনোনয়ন পাওয়া একাধিক নেতার কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তারা বিশদ জানাতে পারেননি।
ফ্যামিলি কার্ড থেকে এই মুহূর্তে কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশের এখন প্রথম প্রায়োরিটি হওয়া উচিত কর্মসংস্থান তৈরি, যেটা উৎপাদনের রোল প্লে করবে। আমাদের জিডিপি যে নিচের দিকে সেটাকে উর্ধ্বগামী করতে সক্ষমতা অর্জন করবে। তার জন্য দরকার কিন্তু বিনিয়োগ। তাই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কর্মসংস্থান তৈরির বিকল্প ণেই।
বিভিন্ন কার্ড বা সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা সঠিক ভুক্তভোগী বাছাই করতে না পারা মন্তব্য করে এই অধ্যাপক বলেন, ৪৫-৫৫ রং সিলেকশন হয়, তার মানে কি? আপনার যাকে দেওয়া উচিত তাকে দিচ্ছেন না। আর যার পাওয়া উচিত সে পাচ্ছে না। এখন চাহিদাসম্পন্ন মানুষ পাবেন বলা সহজ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা কীভাবে ঠিক করবেন? সেটা যদি স্বচ্ছভাবে হয় তাহলে মানুষ উপকার পাবে। তবে এক্ষেত্রে পরিবারের কোন চাহিদা কীভাবে বাছাই করা হবে সেটা বড় প্রশ্ন। অনেকে আয় বা সম্পত্তি লুকিয়ে রেখে এসব কার্ডের পেতে চান, সেটা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছতার জন্য প্রয়োজন সঠিকভাবে মনিটরিং।
কার্ডের মাধ্যমে মাসিক টাকা অথবা সমপরিমাণ খাবার পণ্য দেয়া হতে পারে জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে। আমরা এখন যতটুকু ধারণা করছি, টাকা হিসেবে তাকে একটা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যেটা দিয়ে উনি চাল ডাল তেল কিংবা অন্য কোন দরকারি জিনিস কিনতে পারেন। অথবা সরাসরি খাদ্যপণ্য দেয়া হবে। মূলত ফ্যামিলি কার্ডের বিনিময়ে আমরা পরিবার প্রধানকে কিছু টাকা বরাদ্দ করব।
দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্ড ও ভাতা নিয়ে তিনি বলেন, দেখুন এটা (ফ্যামিলি কার্ড) একটা সিস্টেম হবে। কারণ একসঙ্গে তো এত জিনিস দেওয়া যায় না, মানে ভিজিডি কার্ড বলেন বা অন্য সব কার্ডের একটা সুন্দর সিস্টেম করা, যাতে সব পরিবারে পায় সেটার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এসব কার্ড বাতিল হবে, নাকি এগুলো রেখেই ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেননি বিএনপির এই নেত্রী।
অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশের এখন প্রথম প্রায়োরিটি হওয়া উচিত কর্মসংস্থান তৈরি, যেটা উৎপাদনের রোল প্লে করবে। আমাদের জিডিপি যে নিচের দিকে সেটাকে উর্ধ্বগামী করতে সক্ষমতা অর্জন করবে। তার জন্য দরকার কিন্তু বিনিয়োগ। তাই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কর্মসংস্থান তৈরির বিকল্প ণেই - অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ফ্যামিলি কার্ডের ফ্রেমটা তৈরি হলেও সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা একটা কমিটমেন্ট দিচ্ছি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে তখন ঠিক করা হবে, এই কার্ডের আর্থিক যোগান কোথা থেকে আসবে এবং বিতরণ কীভাবে হবে। আমরা এই কমিটমেন্ট নিয়েই জনগণের কাছে যাচ্ছি।
কার্ডের মাধ্যমে মাসিক টাকা অথবা সমপরিমাণ খাবার পণ্য দেয়া হতে পারে জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে। আমরা এখন যতটুকু ধারণা করছি, টাকা হিসেবে তাকে একটা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যেটা দিয়ে উনি চাল ডাল তেল কিংবা অন্য কোন দরকারি জিনিস কিনতে পারেন। অথবা সরাসরি খাদ্যপণ্য দেয়া হবে। মূলত ফ্যামিলি কার্ডের বিনিময়ে আমরা পরিবার প্রধানকে কিছু টাকা বরাদ্দ করব।
দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্ড ও ভাতা নিয়ে তিনি বলেন, দেখুন এটা (ফ্যামিলি কার্ড) একটা সিস্টেম হবে। কারণ একসঙ্গে তো এত জিনিস দেওয়া যায় না, মানে ভিজিডি কার্ড বলেন বা অন্য সব কার্ডের একটা সুন্দর সিস্টেম করা, যাতে সব পরিবারে পায় সেটার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এসব কার্ড বাতিল হবে, নাকি এগুলো রেখেই ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেননি বিএনপির এই নেত্রী।
ফ্যামিলি কার্ডের ফ্রেমটা তৈরি হলেও সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা একটা কমিটমেন্ট দিচ্ছি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে তখন ঠিক করা হবে, এই কার্ডের আর্থিক যোগান কোথা থেকে আসবে এবং বিতরণ কীভাবে হবে। আমরা এই কমিটমেন্ট নিয়েই জনগণের কাছে যাচ্ছি।