ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলে নেওয়ার পেছনে নানা কারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। সবচেয়ে কম যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হচ্ছে সেটি হলো- পেট্রোডলার। যেটির বৈশ্বিক প্রাধান্য হ্রাস পাওয়ায় হোয়াইট হাউস অনেকটাই উদ্বিগ্ন।
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বর্তমানে খুবই কম, দৈনিক প্রায় ১ মিলিয়ন ব্যারেল। কিন্তু তাদের মজুতের পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্বে যা এককভাবে সর্বোচ্চ এবং মোট মজুদের ১৭ শতাংশ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি এই বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চান। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় বড় মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় গিয়ে মৃতপ্রায় তেল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দেবে।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছেন, লাতিন আমেরিকার দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করবে। এর আনুমানিক বাজার মূল্য ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এই তেল বিক্রির অর্থ তিনি নিজে নিয়ন্ত্রণ করবেন। অর্থ্যাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল থেকে পেট্রোডলার আয় করতে চাইছে। এই আয়ের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে তারা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় আধিপত্য ধরে রেখেছে।
পেট্রোডলারের উত্থান-পতন
‘পেট্রোডলার’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয় ১৯৭০- এর দশকের মাঝামাঝিতে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ডলারের মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য করার ব্যাপারে একমত হয়। এর ফলে ডলারের জন্য নতুন চাহিদা তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দৃঢ় হয়।
২০০২ থেকে ২০০৮ এর মাঝামাঝি সময়ে তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম প্রায় ১৫০ ডলারে পৌঁছেছিল। ওই সময়ে পেট্রোডলারের আধিপত্য ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। তখন যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত তেল আমদানি করতো। এতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো অনেক বেশি বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত পাওয়া শুরু করে। এই উদ্বৃত্তের বড় অংশ আবার বিনিয়োগ হতো মার্কিন ট্রেজারি মার্কেটে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। শেল থেকে তেল উৎপাদনে বিপ্লব ঘটার পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদকে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে তারা শীর্ষ রপ্তানিকারক। অন্যদিকে, সৌদি আরবের মতো অনেক উৎপাদক দেশ তাদের তেলনির্ভর বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশীয় বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যবহার শুরু করেছে।
একই সময়ে চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। নতুন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ডলারের মাধ্যমে তেলের দাম মূল্যায়নের প্রবণতা কমেছে। আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এখন ডলার নয়, ইউরো বা চীনা ইউয়ানের মাধ্যমে মূল্যায়িত হচ্ছে।
এ কারণে ডলার ও তেলের সম্পর্কও বদলে গেছে। জেপি মরগানের বিশ্লেষকের মতে, ২০০৫-১৩ সময়কালে বৈশ্বিক বাণিজ্যে (ট্রেড-ওয়েটেড) ডলারের মান যখন ১ শতাংশ বেড়েছিল, তখন ব্রেন্ট ক্রুডের (হালকা মিষ্টি তেলের বিশেষ শ্রেণী) দাম কমে যায় ৩ শতাংশ। ২০১৪-২২ সময়কালে ডলারের মান যখন ১ শতাংশ বাড়ে তখন ব্রেন্টের দাম কমে মাত্র ০.২ শতাংশ। সাধারণত, ডলারের মান ও তেলের দাম সবসময় বিপরীতমুখী। কিন্তু গত বছর উভয়েরই মান ও দামে পতন ঘটে। যা পেট্রোডলারের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
ট্রাম্পের আঘাত
বিশ্ব বাণিজ্যে ডলার এখনও প্রধান মুদ্রা হিসেবে থাকলেও এর মান কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভগুলোতে ডলারের পরিমাণ গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এ অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে। ভেনেজুয়েলার ঘটনাও এই প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার আগে ডলারের প্রভাব কমা ঠেকাতে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন এ ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তারা ডলারের সঙ্গে যুক্ত ‘স্টেবলকয়েন’ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের প্রচার বাড়িয়েছে। এর লক্ষ্য ডিজিটাল লেনদেন ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে তারা এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে, যারা ডলারের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ব্রিকস-এর সদস্য বেশি। যেমন- ভারত, রাশিয়া ও চীন।
চীন ও রাশিয়া যখন নিকোলাস মাদুরো প্রশাসনের নিকট মিত্রে পরিণত হয়েছে, তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ভাণ্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও ডলারের মান ফেরানোর চেষ্টার অংশ হতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো হাং ট্রানের মতে, ডলার এখনও তেলের বাজারের প্রধান মুদ্রা। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এটিকে রক্ষা করতে চাইছে।
যুক্তরাজ্যের উইনচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রিচার্ড ওয়ার্নারও এ বিষয়ে একমত। তিনি বলেন, কারাকাসে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপগুলো সম্ভবত পেট্রোডলারের ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমন কঠোর পদক্ষেপে অন্যরা হতাশা হতে পারে। কেবল মুদ্রার মান ধরে রাখতে ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ঘটনা ব্রিকস কিংবা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর বিরক্তির কারণ হবে। তখন পেট্রোডলারের মান আরও দ্রুত কমবে। বাস্তবে তা হয় কি না সেটি এখন দেখার বিষয়।