Image description

মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে চট্টগ্রামের রাজনীতি দুই অঞ্চলে বিভক্ত। মিরসরাই উপজেলা থেকে রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত উত্তর চট্টগ্রাম। আর কর্ণফুলী নদীর অন্য প্রান্ত থেকে কক্সবাজার সীমান্ত পর্যন্ত দক্ষিণ চট্টগ্রাম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি সংসদীয় আসন থেকে প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনী আবহকে জমজমাট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের শক্ত অবস্থান ও এলডিপি প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের জোটের কারণে এবার দক্ষিণ চট্টগ্রামে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আশা করছেন রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের আসনগুলো হলো চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া), চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ), চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী)। দেশের অর্থনীতির জন্যও দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও এ এলাকার সংসদীয় আসনগুলো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের ফলে ভূভাগের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের সঙ্গে এ এলাকার সংযুক্তি স্থাপন হয়েছে। এছাড়া বাঁশখালীতে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আনোয়ারা, দোহাজারীসহ কয়েকটি এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল, আনোয়ারা-পটিয়া এলাকায় ভারী শিল্প, দক্ষিণ চট্টগ্রামসংলগ্ন কক্সবাজার অঞ্চলকে ঘিরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ায় নির্বাচনের মাঠেও এর প্রভাব থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একাধিক প্রকল্পের কারণে স্থানীয়দের ভূমি হারানোর পর কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রার্থীদের চিন্তা, পরিকল্পনাও এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন জসীম উদ্দিন আহমেদ। দীর্ঘ ২৪ বছর পর এ আসনে কোনো প্রার্থী দিল বিএনপি। এর আগে জোটের কারণে আসনটি এলডিপিকে ছেড়ে দিত বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগ আমলে সরকারদলীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় এরই মধ্যে জসীম উদ্দিন আহমেদ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন। একই আসনে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে এলডিপি থেকে দলটির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের (বীর বিক্রম) ছেলে ওমর ফারুক নির্বাচন করছেন। কর্নেল অলি আহমদের নিজ এলাকা হওয়ায় এখানে এবার বিএনপি-এলডিপি জমজমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

জামায়াতের জোটসঙ্গী এলডিপির মনোনীত প্রার্থী ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনের মাঠে ভোটাররাই যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেবে। বাংলাদেশকে নিয়ে যারা ভাবে, দেশকেই প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতি করতে চায়—মানুষ এমন প্রার্থীকে ভোট দেবে। ভোটাররা এখন পরদেশনির্ভর কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দিতে চায় না।’

জামায়াতে ইসলামীর জন্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্বস্তির সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-১৫। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া উপজেলার এ আসনে দলটির শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ আসনে একাধিকবার জামায়াতের প্রার্থীর জয়ী হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এখানে চট্টগ্রামের সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম—মাত্র তিনজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সবার মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। একাধিকবার নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সংসদ সদস্য ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর পাশাপাশি বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীন ছাড়াও এ আসনে মনোনয়ন নিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শরীফুল আলম চৌধুরী।

চট্টগ্রাম-১৩ আসনের আনোয়ারা-কর্ণফুলী উপজেলায় বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো জটিলতায় নেই। এ আসনে বিএনপি থেকে মো. আলী আব্বাস মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও প্রার্থী নিজেই প্রস্তাবকারী ও দলীয় মনোনয়ন না থাকায় প্রার্থিতা বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এ আসনে নয়জন প্রার্থীর মধ্যে দুজনের প্রার্থিতা বাতিল হলেও সাতজনের মনোনয়ন বৈধ বিবেচিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী থেকে এ আসনে নির্বাচন করছেন মাহমুদুল হাসান।

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া উপজেলা) আসনে ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও সর্বোচ্চ চারজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এলডিপি, জাতীয় পার্টি ও দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোয়ন বাতিল হওয়ায় এ আসনে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। বিএনপির মোহাম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এসএম বেলাল নূর, জাতীয় পার্টির আরেক প্রার্থী ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ আবু তালেব হেলালী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ছৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু ও গণঅধিকার পরিষদের এমদাদুল হাসান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের আরো একটি জমজমাট নির্বাচনের আশা করা হচ্ছে বাঁশখালী উপজেলায় (চট্টগ্রাম-১৬)। সমুদ্র তীরবর্তী এ সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান রয়েছে। এখানে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। বিএনপির প্রভাব বেশি থাকলেও এ আসনের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। বিএনপির সাবেক এমপি ও মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হলেও তার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) মোহাম্মদ লেয়াকত আলী। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী লেয়াকত শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে যেকোনো দলেরই আসনটিতে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ আসনের স্বতন্ত্র তথা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন বাঁশখালীর মানুষের পাশে ছিল তাকেই ভোট দেবেন ভোটাররা। দলের মার্কা নয়, বরং যোগ্য প্রার্থী হিসেবে আমাকে এ এলাকার মানুষ সমর্থন দিয়েছে। আমি চেষ্টা করব ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করতে।’ বাঁশখালীতে এবার নতুন ইতিহাস রচিত হবে বলে জানান তিনি।