Image description

চট্টগ্রামের ‘ক্রাইম জোন’ খ্যাত রাউজান উপজেলায় হত্যা, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ ও সহিংসতার লাগাম কিছুতেই টানা যাচ্ছে না। ২৪৬ দশমিক ৫৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। পাহাড়, নদী ও খালবেষ্টিত রাউজানে বসবাস করেন ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৮ জন মানুষ। শিক্ষার হার ৮৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ হলেও কয়েকটি বিপথগামী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে পুরো উপজেলাই এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজান আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে কিনা তা নিয়ে ভোটার ও প্রার্থীদের মাঝে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে রাউজানে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীর অস্তিত্ব থাকলেও গত বছরের ৫ আগস্টের পর এসব বাহিনীর তৎপরতা ও সংখ্যা যেন আরও বেড়ে গেছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু ও মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং অপহরণ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছেই। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, গুলিবর্ষণ ও হামলা এখন এখানকার নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজান উপজেলায় কমপক্ষে ১৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৩টি হত্যাকাণ্ডই সংঘটিত হয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ ঘটনাতেই দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু এসব ঘটনায় জড়িতদের বড় একটি অংশ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

 

সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি রাতে উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা জানে আলম সিকদার (৫০)। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এবং রাউজান বিএনপির একাংশের নেতৃত্বদানকারী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিজ বাড়ির সামনেই দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই হত্যাকাণ্ডের পর রাউজান জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে সোমবার রাতে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের রাউজান মুন্সিরঘাটা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। প্রায় একঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখা এই বিক্ষোভ সমাবেশে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে রাউজানে হত্যার শিকার হন আলমগীর ও আবদুল হাকিম নামে আরও দুই জন।

রাউজানে ১৫ মাসে ১৮ হত্যাকাণ্ড

জানে আলম, আলমগীর ও আবদুল হাকিম ছাড়াও রাউজানে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিরা হলেন– বিএনপির কমর উদ্দিন, মো. ইব্রাহিম, মানিক আবদুল্লাহ, মুহাম্মদ সেলিম, দিদারুল আলম ও ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের চার জন আবদুল মান্নান, মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, আবু তাহের ও মুহাম্মদ হাসান।

এরমধ্যে ৫ জানুয়ারি রাতে উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা জানে আলম সিকদার (৫০)। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।  এর আগে গত বছরের ২৫ অক্টোবর বিকাল ৫টার দিকে রাউজান উপজেলার পৌরসভার রশিদারপাড়া সড়কে আলমগীর ওরফে আলমকে (৫০) গতিরোধ করে দুর্বৃত্তরা গুলি করে পালিয়ে যায়। এর আগে ৭ অক্টোবর বিকালে মদুনাঘাট এলাকায় নিজ প্রাইভেটকারের ভেতর বিএনপিকর্মী আবদুল হাকিমকে গুলি করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। ১৫ মার্চ ছুরিকাঘাতে নিহত হন কমরউদ্দিন জিতু। ২২ এপ্রিল দোকানে ডেকে এনে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় ইব্রাহিমকে, ১৯ এপ্রিল রাতে গুলি করে এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আবদুল্লাহ মানিককে। ৬ জুলাই স্ত্রী-কন্যার সামনে সেলিম উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে বোরকা পরিহিত অস্ত্রধারীরা। গত ১০ জুলাই সকালে কাউখালি উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম লুঙ্গিপাড়া এলাকা থেকে যুবদলকর্মী দিদারুল আলম রিংকুর (৪০) লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২৪ জানুয়ারি বাড়ির মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে এসে নিজ বাড়ির সামনে হত্যার শিকার হন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। 

এ ছাড়াও গত বছরের ২৮ আগস্ট রাউজানে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আব্দুল মান্নান নামে এক ব্যক্তিকে। এ ঘটনার তিন দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর ইউসুফ মিয়া নামে আরেক যুবককে হত্যা করা হয়। ১১ নভেম্বর আবু তাহের নামে একজনকে হত্যা করা হয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পিটিয়ে হত্যা করা হয় মুহাম্মদ হাসান নামে একজনকে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে অন্তত ৬৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ১৮টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। নিহতদের মধ্যে বিএনপি ও যুবদলের আট জন, আওয়ামী লীগের চার জন এবং একজন ব্যবসায়ী রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাউজানে বিএনপির রাজনীতি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, অন্য অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকার। দুই জনই আসন্ন জাতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়তে মনোনয়ন নিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে প্রায় সব ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অন্য এলাকায় যেখানে সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে গেছে, সেখানে রাউজানে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের অনেক সন্ত্রাসী দলীয় পরিচয় বদলে বিএনপির দুই পক্ষের অনুসারী সেজে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ আমলে পালিয়ে থাকা ও বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া অপরাধীরাও।

এদিকে, রাউজান থানা পুলিশ জানিয়েছে, গত এক বছরে বেশ কয়েকজন অস্ত্রধারী তথা তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে গ্রেফতারের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা পুনরায় জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে। একইভাবে গত ১০ নভেম্বর পৌরসভা থেকে গ্রেফতার করা হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইকবাল হোসেন চৌধুরী ওরফে মেজর ইকবালকে (৫২)। তার বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যাসহ ৪০টির মতো মামলা ছিল। গ্রেফতারের পর এক মাস না যেতেই এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী পুনরায় জামিনে বের হয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। রাউজানের ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় রয়েছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। তারা রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘রাউজানে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। এ হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার বিএনপি নেতা জানে আলম সিকদার। রাউজানে গত বছরের ৫ আগস্টের পর ১৭-১৮টি খুনের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ একটি হত্যাকাণ্ডেরও ক্লু উদ্ঘাটন করতে পারেনি। ধরা পড়েনি প্রকৃত হত্যাকারীরা। এ কারণে রাউজানে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। আমরা যারা রাজনীতি করি, এলাকায় আসতে ভয় পাচ্ছি।’

মো. ইদ্রিস নামে রাউজান নোয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা জানান, ‘এক সময় রাত ১২টা-১টায় নোয়াপাড়া পথেরহাট বাজারে লোকজনে জমজমাট থাকতো। এখন সন্ধ্যা হলেই ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিএনপির বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে মারামারি, সংঘর্ষের ঘটনায় সন্ধ্যার পর মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এ কারণে লোকজন বাজারে আসেন না।’

একই অবস্থা রাউজান পাহাড়তলী বাজারেও। এ বাজারের দোকানি মো. ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারকে ঘিরে কতিপয় ব্যক্তিদের চাঁদাবাজি বেড়েছে। ৫ আগস্টের পর অনেক দোকানে মালামাল লুট হয়েছে। এখনও চাঁদা না পেলে জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজান আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. শাহজাহান মঞ্জু।  তিনি বলেন, ‘রাউজানে সন্ত্রাসীদের যে দাপট রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনও সম্ভব হবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হবে।’

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘জানে আলম সিকদার নিহতের ঘটনায় আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। হত্যায় জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।’