জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটে চরমোনাইয়ের পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে এখনো দরকষাকষি চলছে। তবে এ নিয়ে সৃষ্ট টানাপোড়েন প্রায় কেটে গেছে। প্রধান দুই দলের পক্ষ থেকেই শেষ পর্যন্ত সমঝোতার ইঙ্গিতই দেওয়া হচ্ছে। উভয় দলই ছাড়ের মানসিকতা নিয়ে সমঝোতার পক্ষে। কারণ, আসন নিয়ে টানাপোড়েন থাকলেও কোনো দলই জোট ভাঙার দায় নিতে চাইছে না।
সূত্র জানায়, জামায়াতের পক্ষ থেকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য প্রথমে ৩১টি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় ইসলামী আন্দোলন। এমনকি কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক আসন না পেলে সমঝোতা প্রক্রিয়ায় না থাকারও আভাস দেন দলটির শীর্ষ নেতারা। প্রথমে তাদের প্রত্যাশা শতাধিক আসন হলেও পরে তা প্রায় ৭০টিতে নেমে আসে। এরপর দুই দলের নেতারা দফায় দফায় বৈঠকে বসলেও এতদিন চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এ নিয়ে গতকাল সোমবার রাতেও সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা। এ সময়ে শেষ না হলেও আজকের মধ্যে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
তবে আসন সমঝোতায় তারা কাছাকাছি এসেছে বলে দল দুটোর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সূত্র মতে, জামায়াতের পক্ষ থেকে আরো ৫টি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, এতে ইসলামী আন্দোলনের আসন সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৩৬। তবে শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি করে ৪০টিতেও পৌঁছাতে পারে। জামায়াত কোনোভাবেই দলটির জন্য এর বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয়।
সমঝোতা প্রক্রিয়া নিয়ে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন বলেন, দুই পক্ষই জোটবদ্ধ থাকতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সবার ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই আলোচনা এগোচ্ছে।
একই ধরনের মন্তব্য করে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ বলেন, আমাদের মধ্যে সমঝোতা প্রক্রিয়া টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এ নিয়ে সোমবার রাতে বৈঠক আছে। রাতের মধ্যে আলোচনা শেষ না হলেও মঙ্গলবার আশা করি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। কম-বেশি সবারই ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে সমঝোতা প্রক্রিয়ায় থাকা বিভিন্ন দলের জন্য জামায়াত অনেক বেশি আসন ছেড়েছে বলে নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে চাপ বাড়ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের জন্য জামায়াতের বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় আসন ছাড়তে হয়েছে বলে দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের আসনও রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের দ্যবি-জামায়াত এনসিপির জন্য ৩০টি আসন ছেড়েছে। সে তুলনায় ইসলামী আন্দোলনের আসন অনেক কম। ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা থাকলেও এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের আসন সমঝোতা নিয়ে তেমন বেগ পেতে হয়নি। একই সঙ্গে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আসন নিয়ে কোনো জটিলতা না হওয়ায় জামায়াত নেতারা সন্তুষ্ট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থন এমনিতেই অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার ও বীর বিক্রম অলি আহমদের এলডিপি এবং জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপিসহ ১১ দলীয় সমঝোতার মাধ্যমে সব আসনে একক প্রার্থী দিলে তাদের পক্ষে বড় জয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। এজন্য এই প্রক্রিয়াকে সংশ্লিষ্ট সবাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
আসন সমঝোতা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, প্রথমে আট দলীয় হলেও পরে ১০ দল এবং এখন ১১ দলীয় সমঝোতায় রূপ নিয়েছে। নতুন করে অনেক দল যুক্ত হওয়ায় আসন পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়েছে। সবার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এখন ইসলামী আন্দোলনসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। এতে বড় আকারের টানাপড়েন বলতে কিছু নেই। যেসব আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতা হচ্ছে, সেখানে নিরপেক্ষভাবে জরিপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্র মতে, আসন সমঝোতায় থাকা আট দলের সঙ্গে নতুন দুটিকে যুক্ত করে গত ২৮ ডিসেম্বর ১০ দলীয় সমঝোতার ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলগুলোর মধ্যে রয়েছে-লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পাটি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পাটি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পাটি (বিডিপি)। পরে এর সঙ্গে আমার বাংলাদেশ (এবি) পাটি যুক্ত হয়ে ১১ দলীয় সমঝোতায় রূপ নিয়েছে। কথা বলে
তবে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১১ দল মিলে ৩০০ আসনের বিপরীতে সাত শতাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ২৭৬, ইসলামী আন্দোলন ২৭২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯০, খেলাফত মজলিস ৬৭, এনসিপি ৪৭ও এলডিপি ১৪টির মতো আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। সমঝোতা হওয়া কিছু আসনে একক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা পড়লেও বেশিরভাগ জায়গায় একাধিক দলের প্রার্থী রয়েছে। এসব নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ অস্বস্তি দেখা দেয়। অবশ্য যাচাই-বাছাইয়ে বেশ কিছু প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সেগুলো ফিরে পেতে চলছে আপিল প্রক্রিয়া। ফলে সমঝোতার হিসাব-নিকাশে এটাও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র মতে, ১১ দলীয় সমঝোতার ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামী অন্তত ১৯০ আসনে নির্বাচন করতে চায়। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন সর্বোচ্চ ৪০, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৫. খেলাফত মজলিস ৮, এলডিপি ৭. এবি পাটি ৩, বিডিপি ২টি আসন পেতে পারে। এছাড়া জাগপা, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন দুই-একটি আসন পেতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
সমঝোতা প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানান, ১১ দলীয় জোট ভাঙছে না। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে দূরত্ব কমে এসেছে। টানাপড়েন কেটে গেছে। মঙ্গলবারের মধ্যে আসন চূড়ান্তের বিষয়ে বৈঠক হবে।
অন্যদিকে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, আসন বিন্যাস নিয়ে আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হইনি। খুব অঙ্কল্প সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। তখন জানা যাবে; কতটি আসনে শাপলা কলি প্রতীকে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
আসন সমঝোতায় যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের শক্তি এবং জুলাইয়ের শক্তি একত্রিত হয়েছি। আমরা আসন সমঝোতা করেছি। আমরা যে আসনে প্রার্থী দেব, জামায়াত সেই আসনে প্রার্থী দেবে না। একইভাবে তারা যেখানে প্রার্থী দেবে আমরাও সেখানে দেব না।
তিনি আরো বলেন, আমরা কাজ করব বাংলাদেশের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। জামায়াতও একই জিনিস চায়। সেজন্য আমরা জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় এসেছি।