Image description

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কি ভাঙনের পথে? দলটির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। একের পর এক নেতার পদত্যাগ, নেতৃত্বে মতবিরোধ, জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তি এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব মিলিয়ে দলটি এখন কঠিন সময় পার করছে, এটা বলাই যায়।

বিশেষ করে গত ৫ নভেম্বর দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি শুধু একজন নেত্রী নন। এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের পরিচিত মুখও। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পুরোনো বিরোধ আবার সামনে এসেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, এনসিপি কি সত্যিই ভেঙে যাচ্ছে? নাকি এটি একটি নতুন রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক বিকাশের সংকট? বিষয়টি বুঝতে হলে পদত্যাগের কারণ, নেতৃত্বের অবস্থান, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—সব দিক দেখতে হবে।

পদত্যাগের শুরু যেভাবে

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের একটি অংশ দলটি গড়ে তোলে। তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল, প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা।

শুরুতে দলটি তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগ্রহ তৈরি করেছিল। কিন্তু খুব বেশি দিন তা ধরে রাখা যায়নি।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট বা ঐক্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এনসিপি। এরপরই দলটিতে বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা দেয়। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ১১ দিনে অন্তত ১৮ জন শীর্ষ ও দ্বিতীয় সারির নেতা দলীয় পদ ছেড়েছেন অথবা নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এটি ছিল এনসিপির প্রথম বড় সাংগঠনিক ধাক্কা। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে এনসিপির কেন্দ্র থেকে জেলা ও মহানগরের অন্তত ৪৩ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন।

এনসিপি নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। ছবি : সংগৃহীতকেন পদত্যাগ করেছেন নেতারা?

 

পদত্যাগকারীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট। এনসিপির অনেক নেতার ধারণা ছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হয়েছে, তার সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তাদের প্রশ্ন ছিল, যে দল পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছিল, সেই দল কেন শেষ পর্যন্ত প্রচলিত জোটের রাজনীতিতে ফিরে গেল?

তাসনিম জারা, তাজনুভা জাবীন, মীর আরশাদুল হক, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানীসহ একাধিক নেতা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তখন কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন।

যদিও এনসিপি নেতৃত্ব শুরু থেকেই জামায়াত জোটকে নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। রাজনৈতিক একীভূতকরণ হিসেবে নয়। তবে এই ব্যাখ্যা দলের ভেতরের বিরোধ পুরোপুরি মেটাতে পারেনি।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জোটের সিদ্ধান্তকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক দলে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে।

দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও জানিয়েছিলেন, জোটের সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন দল ছেড়েছেন। তবে তাদের জন্য দলের দরজা খোলা রয়েছে।

এরপর যে কারণটি সামনে এসেছে সেটি-সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব। পদত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবার মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয় না বা হচ্ছিল না।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের আগে ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে আপত্তি জানিয়ে স্মারকলিপিও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব জামায়াত জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এতে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এরপর আকেটি অন্যতম কারণ সামনে আসে তা হলো- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে যাওয়া। দলত্যাগী নেতাদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এনসিপি শুধু একটি নির্বাচনী দল হওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। দলটির জন্ম হয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কার, বৈষম্য দূর করা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা থেকে। তাদের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই লক্ষ্য পেছনে পড়ে গেছে। নির্বাচনে আসন পাওয়া এবং ক্ষমতার সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পদত্যাগের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ এটাই দাঁড়ায়।

এরপর আরেকটি বিষয় নতুন করে সামনে এনেছেন সদ্যপদত্যাগী সামান্তা শারমিন। সেটি হলো, নারীদের নেতৃত্বে যথাযথ জায়গা না পাওয়া। সামান্তার অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও দলের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি।

তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, নিয়মিত কাউন্সিল না করে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে।

দলের আদর্শিক পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে এনসিপিতে। তারা শুরুতে নিজেকে মধ্যপন্থি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংস্কারপন্থি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোটের পর দলটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অনেকে মনে করছেন, এতে এনসিপির স্বতন্ত্র পরিচয় দুর্বল হয়েছে।

এনসিপির দলীয় কর্মসূচিতে নাহিদ-আখতারের পাশেই সামান্তা শারমিন। ছবি : সংগৃহীতএনসিপির দলীয় কর্মসূচিতে নাহিদ-আখতারের পাশেই সামান্তা শারমিন। ছবি : সংগৃহীতসামান্তা শারমিনের পদত্যাগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সামান্তা শারমিনের পদত্যাগকে শুধু আরেকটি পদত্যাগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি প্রায় এক বছর ধরে দলের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন বলে পদত্যাগের পর জানিয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করেছেন। বিকল্প রাজনৈতিক কৌশলের প্রস্তাব দিয়েছেন।

নারীদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু তার বক্তব্য অনুযায়ী, শীর্ষ নেতারা এসব বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে সামান্তাকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। তাকে ১৬ সদস্যের রাজনৈতিক পরিষদ থেকেও বাদ দেওয়া হয়। এরপর ৫ নভেম্বর তিনি দল ছাড়েন। অর্থাৎ, তার পদত্যাগের পেছনে শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোট নয়, নেতৃত্বের কাঠামো ও দলে নিজের অবস্থান নিয়েও অসন্তোষ ছিল।

সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুধু এনসিপির ভেতরে নয়, দলের বাইরের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

৫ নভেম্বর রাতে সাবেক এনসিপি নেত্রী ডা. তাসনিম জারা ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি সামান্তা শারমিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন। তাসনিম জারা লেখেন, রাজনীতিতে কথা বলার মানুষের অভাব নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার মানুষের সংখ্যা খুব কম। সামান্তা তাদেরই একজন।

তিনি আরও লেখেন, ব্যস্ততার মধ্যেও কেউ কথা বলতে এলে সামান্তা নিজের কাজ থামিয়ে তার কথা শোনেন। মানুষের জীবন বুঝতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে তিনি মানুষের কাছে যান।

তাসনিম জারার মন্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, সামান্তার রাজনৈতিক পথচলা এখনো অনেক বাকি। দেশের রাজনীতিতে তার মতো মানুষের জায়গা আরও বড় হওয়া প্রয়োজন। এ বক্তব্যকে সামান্তার প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক সমর্থনের প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। একই সঙ্গে এটি এনসিপি ছেড়ে যাওয়া নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
এরপর ৬ নভেম্বর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এ নিয়ে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সামান্তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচার।

মাহফুজ আলম বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটি থেকে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন এবং পরে সেটিকে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তাদের নিয়ে অপপ্রচার করা নিন্দনীয়।

তিনি আরও বলেন, যারা দলটির ভিত গড়ে দিয়েছেন, তাদের অনেকেই জোটের কারণে দল ছেড়েছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তারা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন বলেই দলটি একটি সাংগঠনিক কাঠামো পেয়েছিল। কৃতজ্ঞতা দেখাতে না পারলে অন্তত রাজনৈতিক সহাবস্থান ও ভালো চর্চার স্বার্থে নীরব থাকা উচিত।

এ বক্তব্যে মাহফুজ আলম সরাসরি এনসিপির নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন—এমনটা বলা যাবে না। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠকদের অবদান স্বীকার এবং দলত্যাগীদের নিয়ে অপপ্রচার বন্ধের যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

তাসনিম জারা ও মাহফুজ আলমের বক্তব্যের ধরন আলাদা। তাসনিম জারা সামান্তার ব্যক্তিগত গুণাবলি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন। মাহফুজ আলম গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের অবদান এবং তাদের প্রতি রাজনৈতিক সৌজন্য দেখানোর বিষয়ে।

তবে দুটি বক্তব্যের মধ্যে একটি মিল রয়েছে। দুজনই সামান্তা শারমিনের রাজনৈতিক অবদানকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

এখানেই এনসিপির জন্য একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। দল গঠনের সময় যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হলে নেতৃত্ব কীভাবে তা সামাল দেবে?
একটি নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মতবিরোধের পর যদি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকেরা দল ছাড়েন এবং তাদের নিয়ে অপপ্রচার ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে, তাহলে দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ তাই শুধু একজন নেত্রীর দলত্যাগ নয়। এটি এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন ঐক্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
মাহফুজ আলম ও তাসনিম জারার প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ এখন আর শুধু এনসিপির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক পরিসর, নেতৃত্বের আচরণ এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতিও এর সঙ্গে আলোচনায় চলে এসেছে।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের পর এনসিপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি ছয়টি আসন পায়। সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাওয়া দলটির জন্য একটি অর্জন বটে। কিন্তু ছয়টি আসন পেলেই শক্তিশালী স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠা যায় না।
নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য সামনে এসেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনসিপি নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়াতে এবং আলাদা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে। দুই দলের মধ্যে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের মেয়র পদ নিয়েও মতপার্থক্যের কথা উঠে এসেছে। তবে এনসিপি নেতারা জোট ছাড়ার গুঞ্জন অস্বীকার করেছেন। যৌথ কর্মসূচি কমানোকে তারা কৌশলগত অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

এনসিপির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, নতুন দলের প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখন আগের মতো নেই। দলের আদর্শিক অবস্থান নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখতে হলে তরুণদের নতুন করে সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, আন্দোলনের ঐক্যকে রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দিতে না পারলে সেই সম্ভাবনা হারিয়ে যেতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম আল-জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, এনসিপির শক্তিশালী ও স্বাধীন তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সীমিত। সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এর বড় বাধা। তবে দলটি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে এবং সংগঠন শক্তিশালী করতে পারলে সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।

এ বক্তব্যগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। এনসিপির সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা।

সবশেষ সরাসরি বললে, এনসিপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়নি। দলটির নেতৃত্বও দায়িত্ব পালন করছে। সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক কার্যক্রমও চলছে। কিন্তু তাদের ভেতরে বিভক্তির লক্ষণ স্পষ্ট।

ভাঙনের ঝুঁকি বোঝার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নেতৃত্বের সংকট। প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একটি অংশ দল ছেড়েছেন। ফলে নেতৃত্বের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য কমার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আদর্শিক বিভক্তি। এনসিপি আসলে কোন ধরনের দল হতে চায়, তা স্পষ্ট হয়নি এখনো। দলটি কি মধ্যপন্থি ও সংস্কারপন্থি রাজনৈতিক শক্তি হবে? নাকি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে হাঁটবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখন প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, সাংগঠনিক দুর্বলতা। একটি রাজনৈতিক দল শুধু পরিচিত কয়েকজন নেতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন প্রয়োজন। নিয়মিত কাউন্সিল, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা এবং কর্মীদের মতামতের মূল্যায়নও জরুরি। এই তিন জায়গায় দুর্বলতা থাকলে ভবিষ্যতে আরও বিভক্তি তৈরি হতে পারে।

এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন নাহিদ ইসলাম। ছবি : সংগৃহীতএনসিপির সামনে এখন যা করতে পারে তা হলো- তারা নিজেদের আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে পারে, তাহলে নতুন করে জনসমর্থন তৈরির সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার, সংস্কারপন্থি মানুষ এবং প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ জনগোষ্ঠীর কাছে দলটি আবার গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এছাড়া নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধ, আদর্শিক মতপার্থক্য এবং সাংগঠনিক অসন্তোষের সমাধান না হলে দল থেকে আরও নেতা বেরিয়ে যেতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে দলটি নামমাত্র সংগঠন হিসেবে টিকে থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব কমে যেতে পারে।

এনসিপিকে মনে রাখতে হবে, আন্দোলনের জনপ্রিয়তা আর দল পরিচালনা এক বিষয় নয়। চব্বিশের আন্দোলনে বিভিন্ন মত, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষ একটি অভিন্ন দাবিতে এক হয়েছিল। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনা করতে হলে শুধু আন্দোলনের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্পষ্ট আদর্শ, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো।

এনসিপির জন্ম হয়েছিল প্রচলিত রাজনীতির বিকল্প হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। মানুষও দলটির কাছে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে দলটি নিজের ভেতরেই মতপার্থক্য সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ সেই সংকটের সর্বশেষ প্রকাশ। এর আগে তাসনিম জারা, তাজনুভা জাবীনসহ পরিচিত নেতাদের চলে যাওয়াও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কা ছিল।

তবে এখনই এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একটু তাড়াহুড়া হয়ে যাবে। ছয়টি সংসদীয় আসন দলটিকে একটি রাজনৈতিক মঞ্চ দিয়েছে। এই মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠন করতে পারে।

কিন্তু তার জন্য নেতৃত্বকে আগে নিজেদের ভুল, সীমাবদ্ধতা ও মতপার্থক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—দলটি কি ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থে নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করার জন্য?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এনসিপি ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হবে, নাকি প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের সম্ভাবনার বড় অংশ হারিয়ে ফেলবে।