বেতন বাড়ানোর দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে টানা তৃতীয় দিনের মতো সংঘর্ষ হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বর সেকশনের মধ্যবর্তী এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এদিকে আন্দোলনের মধ্যে নাশকতা ও ভাঙচুর ঠেকানোর কথা বলে মিরপুর-১১ এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বর সেকশনের মধ্যবর্তী এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা সংঘর্ষে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এর আগে সকালে মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের একটি পোশাক কারখানার সামনে উত্তেজনা দেখা দেয়। কারখানাটির এক নিরাপত্তাকর্মী গণমাধ্যমকে বলেন, সকালে কারখানা খোলা হলে শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। তবে সকাল আটটার পর একদল লোক কারখানার সামনে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানান। একপর্যায়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। পরে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
সংঘর্ষের পর মালিকপক্ষ অনেক কারখানা বন্ধ করে দেয়। মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের কয়েকটি কারখানার ফটকে শ্রমিকদের অবস্থান করতে দেখা যায়। সেখানে কয়েকজন নারী শ্রমিক বলেন, তাঁরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন। তবে আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগত ব্যক্তিরা ঢুকে ভাঙচুর করছেন, সেটিও সত্য।
শ্রমিকেরা বলেন, বহিরাগতদের কারণে তাঁদের আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তবে এ কারণে ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন বন্ধ রাখতে চান না তাঁরা। তাঁদের দাবি, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘কে শ্রমিক আর কে বহিরাগত, তা তো বোঝা যায় না! সে জন্য তো আমাদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন বন্ধ রাখতে পারি না। আমরা ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা চাই। পুলিশের কাজ বহিরাগতদের খুঁজে বের করা। কিন্তু তারা নিরীহ শ্রমিকদের মারধর-গ্রেপ্তার করছে।’
এদিকে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। পল্লবী থানা যুবদলের এক নেতা বলেন, পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। এ নিয়ে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। তবে আন্দোলনের মধ্যে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঢুকে ভাঙচুর ও নাশকতা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই যুবদল নেতা বলেন, ‘এই নাশকতা ঠেকাতে আমরা মাঠে নেমেছি। গতকালও আমরা তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।’
‘দুষ্কৃতকারীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে পুলিশ
আন্দোলন ও সংঘর্ষের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পিওএম-দক্ষিণ বিভাগ) মো. তৌহিদুল আরিফ গণমাধ্যমকে বলেন, সকালে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে কিছু দুষ্কৃতকারী সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে এবং রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। পুলিশ কঠোর হাতে তাদের দমন করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আরও কঠোর হচ্ছি, কারণ এখন যারা আছেন তারা কোনো অর্থেই গার্মেন্টসকর্মী বা শ্রমিক না। এখন যারা মাঠে আছে, তারা কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আছে—দুষ্কৃতকারী। সে কারণে আমরা কঠোর হাতে দমন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখন সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’
ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় কতজন আহত হয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। কতজনকে আটক করা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। অলিগলিতে কেউ অবস্থান করলে তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।
তৌহিদুল আরিফ আরও বলেন, তাঁর ধারণা, প্রকৃত শ্রমিকেরা এখন আর মাঠে নেই। ছুটির পর তাঁরা বাড়ি ফিরে গেছেন অথবা কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছেন। এখন যাঁরা অবস্থান করছেন, তাঁদের বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া সংঘর্ষের সময় এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে নিরাপত্তার কারণে মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের দুটি গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিরপুর-১১ নম্বর স্টেশনের গেট খুলে দেওয়া হয়।