চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় রাজনৈতিক পক্ষ পরিবর্তন ও যুবদল নেতার অনুসারীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাত ও গুলিতে আহত আবু ইউসুফ ওরফে জীবন (২৭) মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ১১টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আলাউদ্দিন তালুকদার বলেন, মঙ্গলবার রাতে পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জীবনকে হাসপাতালে আনা হয়। পরে বুধবার তাঁর ডান পায়ে অস্ত্রোপচার করে তা কেটে ফেলতে হয়।
প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
এর আগে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে নগরের কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে জীবনকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এরপর থেকে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, যুবদল নেতা জিল্লুর রহমান জুয়েলের অনুসারীদের সঙ্গে বিরোধ এবং রাজনৈতিক পক্ষ পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে জীবনের ওপর হামলা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জুয়েল।
হামলার পর মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে জীবন অভিযোগ করেন, ইকরাম বাবু ও আরমান তাঁকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ঘটনার সময় জীবনসহ চার-পাঁচজন কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচিত ইকরাম বাবু, আরমান, মেহেদী, নাবিদসহ ১৩ থেকে ১৪ জন সেখানে গিয়ে অতর্কিত হামলা করেন। তাঁদের দাবি, হামলাকারীদের হাতে ছুরি ও পিস্তল ছিল। তাঁদের কয়েকজন হেলমেট পরা ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হামলাকারীরা প্রথমে জীবনকে কিল-ঘুষি মারেন, পরে ছুরিকাঘাত করেন। একপর্যায়ে ইকরাম বাবু পিস্তল বের করে তাঁর পা লক্ষ্য করে গুলি করেন। হামলার পর হুমকি দিয়ে তাঁরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান জুয়েলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গত দুই বছর ধরে জুয়েলের অনুসারী হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেন জীবন। সম্প্রতি তিনি জুয়েলের পক্ষ ছেড়ে চট্টগ্রাম নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুজ্জামান শিমুলের সঙ্গে যুক্ত হন। এ নিয়ে জুয়েলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি সূত্রগুলোর।
সূত্রগুলোর আরও দাবি, মেহেদী নামে জুয়েলের এক ভাগিনা ও তাঁর কয়েকজন অনুসারীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জীবনের বিরোধ চলছিল। হামলার আগের দিন জীবনের ছোট ভাইকে জোর করে এলাকা থেকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চমেক হাসপাতালে জীবনের মা মোছাম্মৎ শামসুন্নাহার অভিযোগ করেন, জুয়েলের সঙ্গে রাজনীতি করার জন্য তাঁর ছেলেকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু জীবন রাজনীতি বা চাঁদাবাজিতে জড়াবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
শামসুন্নাহার বলেন, হামলার আগে তাঁর ছোট ছেলে ইমনকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে মারধর করেন জুয়েলের লোকজন। পরে জুয়েল তাঁকে হুমকি দিয়ে বলেন, ইমন বাসায় ফিরে আসবে, কিন্তু জীবন এলাকায় থাকতে পারবে না। কুঞ্জছায়া এলাকা ছেড়ে না গেলে জীবনকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জীবনের মা আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জিল্লুর রহমান জুয়েল বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য নয়। কাউকে তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করতে তিনি জোর করেননি।
জুয়েল বলেন, হামলাকারী ও আহত ব্যক্তি সবাই তাঁর ভাগিনা এবং পাশের এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা নেই। নিজেদের মধ্যে বিরোধ থেকেই হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। এলাকায় চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।
জীবনের মায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে জুয়েল বলেন, কোনো পক্ষ হয়তো তাঁকে তাঁর বিরুদ্ধে এসব কথা বলতে বাধ্য করেছে।
শীর্ষনিউজ