গত (২৪ অক্টোবর) শনিবার মারা যান মানিক পশারী। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী ছিলেন তিনি।
পশারীর মৃত্যুর পর তাকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে গার্ড অব অনারে ও পিরোজপুরে মরদেহ দাফনে বাঁধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।
তবে সাঈদী পুত্র ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন যে, মানিক পশারীর দাফনে বাঁধা দেয়নি জামায়াত। তিনি দীর্ঘ এক পোস্টে লিখেন, “লাশ দাফনে বা জানাজায় কোনো বাঁধা ছিলনা, জনগনের আপত্তি ছিল ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে 'গার্ড অব অনার' প্রদানে— যা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা”।
তিনি ওই পোস্টে পশারীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, “ট্রাইবুনালে তার বক্তব্য আমি এখানে হুবহু তুলে ধরছি— "আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই, তবে সহযোগিতা করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। এই জন্য বর্তমান এমপি এ,কে,এম,এ, আওয়াল সাহেব আমার নামে একটি ডিও লেটার দিয়েছে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য। আমি পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে না আগে আমার ঐ ডিও লেটার দিয়েছে তা আমার স্মরন নাই।"
এখানে মানিক পশারী অকপটে স্বীকার করেছে যে সে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নয়। তবে এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আসার আগে তৎকালীন আওয়ামী দোসর কুখ্যাত এমপি আউয়াল তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য একটি ডিও (Demiofficial) লেটার দিয়েছিল। অর্থাৎ, স্রেফ মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল।”
মাসুদ সাঈদীর এ দাবি আলাদা করে যাচাই করতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট।
তবে মাসুদ সাঈদী যে দাবি করেছেন, ‘মানিক পশারীর লাশ দাফনে বাঁধা ছিল না’, তা সত্য নয়।
যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফেসবুকে ভাইরাল একাধিক ভিডিওতে যারা “মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরে হতে দেয়া হবে না” মর্মে মিছিল ও বক্তব্য দিয়েছেন এবং ফেসবুকে ক্যাম্পেইন করেছেন তাদের অনেকেই স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মী।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এ ইস্যুতে বক্তব্য দিচ্ছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বক্তব্য দেওয়ার সময় তার দুই পাশে ও পেছনে অনেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরমধ্যে পেছনে দাঁড়ানো দুইজন ব্যক্তিকে মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন না করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে।
আব্দুর রাজ্জাকের পেছনে দাঁড়ানো পাঞ্জাবি ও টুপি পরিহিত ব্যক্তিকে একটি মিছিলের সামনের সারিতে দেখা গেছে। যে মিছিলটি মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন না করার দাবিতে ছিল।
দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে ওই ব্যক্তির নাম মো মুইন উদ্দিন। যিনি পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি।
এছাড়াও আব্দুর রাজ্জাকের পেছনে আরেকজন মধ্য বয়স্ক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। যাকে মাইক হাতে প্রকাশ্যে মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন না করতে ঘোষণা করতে দেখা গেছে। সে সময় তার গায়ে একটি কালো গেঞ্জি পরিহিত ছিল। যেটার পেছনের অংশে লেখা ছিল, “জননেতা মাসুদ সাঈদীর সালাম নিন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়তে সুযোগ দিন।”
একটি ভিডিওতে তাকে মাইক হাতে বলতে শোনা যায়, “সাঈদীর মামলার বাদী কুলাঙ্গার মানিকের পিরোজপুরের মাটিতে আমরা দাফন করতে দিবো না।”
ওই ব্যক্তির পাশেই মধ্য বয়সী আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনিও পিরোজপুরে দাফন করতে না চাওয়ার মিছিলে ছিলেন এবং মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন করতে দেওয়া হবে না মর্মে স্লোগান দিয়েছেন।
যদিও জামায়াতে ইসলামীতে তাদের কোন পদ-পদবী আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট।
জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যরত আরেকটি ভিডিওতে পেছনে হলুদ পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনিও মানিক পশারীকে দাফন করতে না দেওয়ার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিতে দেখা যায়।
অনলাইনেও ক্যাম্পেইন করেছেন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী
মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাকে পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করে অনলাইনেও পোস্ট দিতে গেছে স্থানীয় জামায়ায়-শিবির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইডি থেকে। যে আইডিগুলোতে জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও পাওয়া যায়।
পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সভাপতি রেদ ওয়ান তার আইডিতে একটি ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, “ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জারজ সন্তান মানিক পাশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর সদর ও জিয়ানগরে ব্যর্থ হয়ে এখন ধারণা করা হচ্ছে- এই কুলাঙ্গারের লাশ নাজিরপুরের কোথাও দাফন দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেখানেও সাঈদী প্রেমিকরা রাত জেগে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। কোনো এলাকাবাসী এই কুলাঙ্গারের লাশ দাফন করতে দিচ্ছে না।”
তিনি আরেকটি পোস্টে লিখেন,, “শহীদ আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার বাদী ও সাক্ষী কুলাঙ্গার মানিক পশারী মারা গেছে। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কোনো জারজ সন্তানের স্থান পিরোজপুরে হবে না।”
Md Aslam Sheikh নামক একটি আইডি থেকে একটি মিছিলের (দাফন পিরোজপুরে না দেওয়ার দাবিতে মিছিল) ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়, “আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার সাক্ষী ও বাদী কুখ্যাত সন্ত্রাসী মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরে হবে না, এই বেয়াদবের বিরুদ্ধে ওর নিজবাড়ী পাড়ের হাটে এলাকাবাসী সাঈদীপ্রেমীদের বিক্ষোভ।”
Aminul Bin Aziz নামক এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেন, “যে"ই মাটিতে আল্লামা সাঈদি ঘুমিয়ে আছেন। সেই মাটিতে কোন কুলাংগারের দাফন হতে পারে না”
তবে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল হক দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, “জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো বাঁধা দেওয়া হয়নি। সাঈদী প্রেমিক জনতা আবেগ ও ভালোবাসা থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন। সেখানে কোনো দলীয় লোকজন থাকলেও থাকতে পারেন, তবে আমাদের কোনো নির্দেশনা ছিল না।”
প্রসঙ্গত, শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর নিজ বাড়িতে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। এর আগে দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে খোঁড়া কবর ভরাট করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। দিনভর বিভিন্ন বাধার মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ও গার্ড অব অনার প্রদানের মধ্য দিয়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার এই বাদীর দাফন সম্পন্ন হয়।