নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও আকারসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। আজ শনিবার অষ্টম বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেছেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠকে সংসদের উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি করে তাকেই উচ্চকক্ষের স্পিকার বানানো এবং ওই স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোটদানের সুযোগ রাখার বিষয়টিও উঠে এসেছে আলোচনায়।
জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই বৈঠক। এতে আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞের মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত হয়ে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে তাদের লিখিত ও মৌখিক মতামত এবং প্রস্তাব দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা কাঠামো কেমন হবে এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সংসদের একই মেয়াদে উচ্চকক্ষ বিলুপ্ত না হলে, সেই উচ্চকক্ষের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কিনা— সে বিষয়ে অনেকে ধারণা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে।’
‘একজন প্রস্তাব করেছেন, ভাইস প্রেসিডেন্টকেই উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। অবশ্য বিকল্প হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ওই স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কিনা, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। একইভাবে স্পিকার ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মধ্য থেকেও সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান রাখা যায় কিনা, সে বিষয়েও প্রস্তাব এসেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চললেও কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি’—বলছিলেন বিশেষ কমিটির সভাপতি।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিরোধী দল যদি কোনো ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট শিথিল করতে চায়, তবে তাদের তা কমিটিতে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে হবে। সংসদীয় চর্চা ও আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিরোধী দলকে বৈঠকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘স্ট্যাটিউটরি বডি’ বা কমিশনগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে, যেখানে অন্তত ছয়টি বডিতে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।’
এদিকে এদিন সন্ধ্যায় সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন ও আকার এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর নীতি, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও কার্যকর ও ক্ষমতায়িত করা এবং জাতীয় সংসদে আইনপ্রণেতাদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগের মতো মৌলিক বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া আলোচনায় বিচারক নিয়োগ আইন প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর স্বাধীন কর্মপরিধি নির্ধারণ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৬ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের মনোনয়নের বিষয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বৈঠকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি—এই চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও ভোটদানের সুযোগ রাখার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সাকিলা ফারজানা অংশগ্রহণ করেন।