Image description

বিভেদ ভুলে ত্রিধাবিভক্ত কওমি ধারার ইসলামী দলগুলো এবার ঐক্যপ্রচেষ্টার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ ধারার নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দল ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্মের ব্যাপারে একমত হয়েছে। যদিও অন্য জোটভুক্ত দলগুলো সেসব জোটে থাকতে পারবে কিনা—সেই প্রশ্নটি ঐক্যের ক্ষেত্রে এখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা।

এদিকে প্ল্যাটফর্মটির প্রাথমিক নজর আছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ওপরও। দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, ঐক্যপ্রচেষ্টা সফল হলে আসন্ন নির্বাচনে সাত ইসলামী দলের একক প্রার্থী থাকবে, যার মধ্যে ইউনিয়ন থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।

আমরা যারা আছি, সবাই সরকারবিরোধী। কেউ সরকারের না। আমরা চাচ্ছি সরকারবিরোধী একটা শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলার জন্য।— মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, মহাসচিব, ইসলামী আন্দোলন

নির্বাচন কমিশনে কওমি ধারার ৭টি দল রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনভুক্ত। এই সাতটি দলই একমত হয়েছে ‘সমমনা ইসলামী দল’-এ অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে। এগুলো হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। কওমি ধারার আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মধ্যস্থতায় হচ্ছে এই ঐক্যপ্রচেষ্টা।

জানা গেছে, আগামী ৫ ডিসেম্বর লিয়াজোঁ কমিটির পরবর্তী বৈঠকের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন জোট গঠনের বিষয়ে আরও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

এক হলে বাড়বে শক্তি
৭ ইসলামী দল বর্তমানে তিন ভাগে বিভক্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪টি দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে ভেড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস সেই জোট ত্যাগ করে এখন ‘একলা চলো’ নীতিতে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি এখনও ১১ দলীয় জোটে রয়ে গেছে। ওই নির্বাচনে একমাত্র ইসলামী দল হিসেবে বিএনপির শরীক ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।

অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচনে স্বতন্ত্র অংশ নেয়। যদিও এর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোট ২০১৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগের অনুগত হিসেবে রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দলটি নিজেদের পুনর্গঠন করে।

সমমনা ইসলামী দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই ঐক্যপ্রচেষ্টার নেপথ্যে অভিভাবক বা মুরুব্বির ভূমিকা পালন করছে হেফাজতে ইসলাম। মূলত হেফাজতের নেতৃত্বে এই সাত দলেরই শীর্ষ নেতারা রয়েছেন। তাদের ভাষ্য, হেফাজত চাচ্ছে কওমি ধারার দলগুলো যেন একই প্ল্যাটফর্মে থাকে। কারণ, রাজনৈতিক কারণে সবাই তিন মেরুতে চলে যাওয়ায় তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রকারান্তরে আমরা তিনটি ভাগে বিভক্ত। সেজন্য হেফাজতে ইসলাম চাচ্ছে যেন আমরা সবাই একসাথে থাকি। একসাথে থাকার ক্ষেত্রে আমাদের রূপরেখাটা কী হতে পারে, সেই হিসেবে সিদ্ধান্ত এসেছে যে কোনো আলাদা জোট নয়, আমরা নিজেরাই এক জোট। রাজনৈতিক কারণে সবাই তিন মেরুতে চলে যাওয়ায় আমাদের শক্তিটা দুর্বল হয়ে গেছে। আমরা এক হলে শক্তিটা মজবুত হবে।

হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন

নজর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে
শীর্ষ নেতারা বলছেন, প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে অভিন্ন ব্যানারে যুগপৎ বা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি পালন করা। দলগুলো নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রেখেই এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আছে বলে জানিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় দুটি রাজনৈতিক দল—জামায়াত এবং বিএনপি এককভাবে ইলেকশন করবে। আমরা (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) এখনো ১১ দলের জোটে আছি, তবে যেহেতু জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করবে, আমাদেরকেও সেভাবে চিন্তা করতে হচ্ছে। যদি সাত দলের ঐক্য হয়, তাহলে সাতটা দল একসাথে ইলেকশন করতে পারি। আমরা মনে করি যে আমাদের সাথে আরও অনেকগুলো দল আসবে। এভাবে সবাই মিলে স্থানীয় সরকারের ইলেকশনটা করব।

একই বক্তব্য মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজীর। তিনি বলেন, যদি একক প্রার্থী দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের অনেক প্রার্থী চেয়ারম্যান-মেম্বার হিসেবে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

জোটের প্রশ্ন সমাধান হয়নি
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের তত্ত্বাবধানে এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে এই ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একটি সূত্রের দাবি, হেফাজতের এই উদ্যোগের মূল শর্তই হলো—সেখানে থাকতে হলে জামায়াত বা বিএনপির মতো অন্য কোনো বড় দলের সঙ্গে জোটে থাকা যাবে না। হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, দলগুলো অন্য জোট ছেড়ে এই প্ল্যাটফর্মে আসতে একমত হয়েছে।

তবে এ নিয়ে ‘ঐকমত্য’ হওয়া দলগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। একটি সূত্রের দাবি, জামায়াত জোটে থাকা দুটি দল তাৎক্ষণিকভাবে ১১ দলীয় জোট ছাড়ার শর্তে ‘আপত্তি’ জানিয়েছে। তাদের মতে, তারা এই নতুন কওমি প্ল্যাটফর্মেও থাকবে, আবার জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান আন্দোলনেও শরিক থাকবে। যদিও অন্য দলগুলো এ বিষয়ে প্রায় একমত।

সাত দলের সভায় অন্য জোট ছাড়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং অনুরোধ জানানো হয়েছে। আমরা বলেছি যে আমরা চিন্তা করব এ ব্যাপারে। এটি শর্ত হলে বৈঠকেই এটা শেষ হয়ে যেত। কারণ আমরা ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছি। ৩১ তারিখে লংমার্চে আমরা যাব। এগুলো নিয়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি। তার মানে এটা শর্ত হিসেবে না, আমাদের প্রতি অনুরোধ হিসেবে হিসেবে বলা হয়েছে।— মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস

খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কওমি দলগুলোর যদি কোনো মোর্চা হয়, তাহলে একই রাজনৈতিক দল তো ভিন্ন ভিন্ন মোর্চার মধ্যে থাকতে পারে না। এটা স্বাভাবিক কথা। কেউ অন্য জোটে থাকবে না। যারা বিএনপির জোটে আছে তারাও চলে আসবে, যারা জামায়াতের সাথে আছে তারাও চলে আসবে।

তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলছেন ভিন্ন কথা। তার ভাষ্য, সাত দলের সভায় এ বিষয়ে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং সবার মতো তাদের প্রতিও অনুরোধ জানানো হয়েছে অন্য জোট ছেড়ে আসার জন্য।

মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলেন, ওনারা একটা অনুরোধ রেখেছেন, আমরা বলেছি যে আমরা চিন্তা করব এ ব্যাপারে। এটি শর্ত হলে বৈঠকেই এটা শেষ হয়ে যেত। কারণ আমরা আজকেও ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। প্রেস ব্রিফিংয়ে আমরা ছিলাম। ৩১ তারিখে লংমার্চে আমরা যাব। এগুলো নিয়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি। তার মানে এটা শর্ত হিসেবে না, আমাদের প্রতি অনুরোধ হিসেবে হিসেবে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ওনাদের (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) দিক থেকে হয়তো ওনারা এমনটা মনে করতে পারেন। তাহলে আলাদা ঐক্য করার প্রয়োজনটাই তো নাই। আমরা আলাদা ঐক্য গড়ে তুলব কেন? এখানে যারা থাকবে—তারা কেউ বিএনপিকে শক্তিশালী করবে, কেউ জামায়াতকে শক্তিশালী করবে; তাহলে এই অবস্থানটা আমরা কেন তৈরি করব? জামায়াত-বিএনপিকে শক্তিশালী করলে আমরা শক্তিশালী হতে পারব না, আমরা তো দুর্বল থেকে যাব। সেটা হয় না।

জামায়াতকে ‘একা’ করতেই কি জোট?
কওমিভিত্তিক দলগুলোর জোট হলে ইসলামী দল হিসেবে একা হয়ে পড়বে বৃহত্তম ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। একই সাথে ১১ দলীয় জোটও আবার ভাঙনের মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ায় কার্যত ৯ দলে পরিণত হয়েছে জোটটি।

ফলে বিরোধীদলীয় ঐক্য ভাঙতে এই উদ্যোগ কিনা, তা নিয়ে ডালপালা মেলেছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনের হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাম্প্রতিক সাক্ষাতের বিষয়টি সামনে আসছে। এ অবস্থায় কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতকে একা করতে এবং বিরোধীদলীয় ঐক্য ভাঙতেই ইসলামী দলগুলোকে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের দলগুলোর অন্দরে শুরু হয়েছে আলোচনা-পর্যালোচনাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন নেতা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এক সময় চেষ্টা করা হত বিএনপি-জামায়াত জোট ভাঙার। এখন চেষ্টা করা হয় যেন এনসিপি-জামায়াত জোট ভাঙা যায়। তাতে বিরোধী দলকে দুর্বল করা সহজ হবে। কিন্তু এ দুই দলের ঐক্য ভাঙতে না পারলেও জামায়াতের প্রতি যেহেতু অন্যান্য সমমনা ইসলামী দলগুলোর এলার্জি আছে, সেহেতু জামায়াত থেকে অন্তত ইসলামী দলগুলোকে যদি বের করা যায়—তাহলেও তাদের রাজনীতি কিছুটা দুর্বল হবে। এটিই এই দল গঠনের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে।

তবে জামায়াতকে ‘একা’ করতে বা জামায়াতকে টার্গেট করে এই জোট—তা বলতে রাজি নন হেফাজতে ইসলাম ও কওমি ধারার দলগুলো। তাদের দাবি, নিজেদের ঐক্যের ‘জরুরত’ থেকেই এই উদ্যোগ। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী বলেন, হেফাজতের আমির সাহেবের মূল টার্গেট হচ্ছে আমরা যেন এক থাকি। আমরা তিন মেরুতে চলে গেছি। ওনার কথা হচ্ছে এক মেরুতে আসি। জামায়াতের জোট ভাঙার জন্য বা সরকারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এই জোট করা হচ্ছে—এমনটা না।

যদিও জামায়াতের বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছেন তিনি। বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সবগুলো দলের মধ্যেই জামায়াতের বিষয়ে আপত্তি আছে। জামায়াতের বিষয়ে হেফাজত আমিরও স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। ওনার এই বক্তব্যের সাথে মামুনুল হক সাহেবের দল ছাড়া হেফাজতের সবগুলো দল একমত। এমনকি মামুনুল হক সাহেব (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির) বলেছেন যে ‘জামায়াতের আকিদাগত সমস্যা আছে, কিন্তু আমরা তাদের সাথে রাজনৈতিকভাবে জোট করছি’।

তিনি বলেন, প্রধানত তিনটি জায়গায় জামায়াতের সঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বিরোধ। প্রথমত, ইসমতে আম্বিয়া; মানে সমস্ত নবী-রাসুলগণ নিষ্পাপ। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদী সাহেব বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন যে তাদের দ্বারাও ভুল হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মিয়ারে হক—সাহাবায়ে কেরাম কি সত্যের মাপকাঠি? মাওলানা মওদুদী সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি মানতে চান না। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের যে মতাদর্শ, এটার মধ্যে সবাই বলে উনারা সত্যের মাপকাঠি। তৃতীয়ত, ইকামতে দ্বীন। জামায়াতে ইসলামীর ভাইয়েরা একামতে দ্বীন মানে বলেন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা। কিন্তু এরকম ব্যাখ্যা মাওলানা মওদূদীর লেখনী ছাড়া কোথাও নাই। নামাজ-রোজাও ইকামতে দ্বীনের অংশ। কিন্তু ওনারা এগুলোকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য প্রশিক্ষণ বলে মনে করেন।  আমাদের জামায়াতের সাথে ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নাই। জামায়াতের সাথে আমাদের বিরোধ থাকে এই ব্যাখ্যাগুলো নিয়ে।

হেফাজতের ‘মুরুব্বিয়ানায়’ ৭ দলের জোট

৭ দলের নেতারা বলছেন, এই জোট গঠনের তৎপরতা ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই শুরু হয়েছিল। একটি কওমি দলের শীর্ষ নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে জামায়াতের জোট থেকে বের করে আনা। নির্বাচনের পর এই প্রক্রিয়াটি আরও গতি পায় এবং গত কয়েক মাস ধরে জোরেশোরে এই প্রক্রিয়াটি চলছিল। চলতি বছরের ১৫ আগস্ট দলগুলোর প্রস্তাব নিয়ে ঢাকার খিলগাঁও মাদ্রাসায় প্রথম রূপরেখা নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক বৈঠক বসে। এর পর ২৬-২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজত আমিরের সঙ্গে লিয়াজোঁ বৈঠক হয়, যেখানে ঐক্যের সাংগঠনিক রূপরেখা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অবশেষে চূড়ান্ত রূপ পেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সমমনা ইসলামী দল’ জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

এরই মধ্যে ২ অক্টোবর হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। ওই দিন ফটিকছড়িতে আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় এই সাক্ষাৎ হয়। এ নিয়ে ঐক্য গঠনের নেপথ্যে রাশেদ খাঁন ও সরকারের ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ১১ দলে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি গিয়েছি—তিনি (আল্লামা বাবুনগরী) একজন মুরুব্বি; বাংলাদেশের যে ইসলামী সেন্টিমেন্ট, সেটার বিস্তারে তার একটা বড় ভূমিকা আছে, সে জায়গা থেকে তার দোয়ার জন্য গিয়েছিলাম। সেখানে কোনো পলিটিক্যাল আলাপ ওই অর্থে হয়নি। এমনকি আমি যাওয়ার আগেও এনসিপির নেতারা গিয়েছেন। আমি যতটুকু জানি জামায়াতের নেতারাও সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ দেননি।

সাত ইসলামী দলের জোটকে শুভকামনা জানিয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সাথে কওমিভিত্তিক যে সংগঠনগুলো, তাদের আকিদাগত এক ধরনের দূরত্ব অনেক আগে থেকেই আছে। জামায়াত ইসলামের নাম নিয়ে মুনাফেকি করে; বিদেশীদের সাথে বৈঠক করে তারা বলে যে শরিয়া আইন কায়েম করব না, আবার গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা আছে— ক্ষমতায় গেলে শরিয়া আইন কায়েম করবে। কোনো কোনো নেতা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একই কথা বলে—কোরআনের আইন চাই, আল্লাহর আইন চাই। এই যে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য...। আসলে ইসলাম তো কোনো ফেলনার বিষয় না যে, যখন তখন যেমন ইচ্ছা মন্তব্য করলাম, ক্ষমতার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করলাম। 

তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সাথে যে ইসলামী দলগুলো আছে, তারাও বুঝতে পারছে যে জামায়াতের সাথে থেকে আপনি কখনো ইসলাম বা ঈমান ধরে রাখতে পারবেন না। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের একটা বড় ধরনের চাপ আছে প্রকৃত ইসলামিক দলগুলো যেন জামায়াতের সঙ্গ থেকে বের হয়ে আসে। কারণ মুনাফেকি আর ইসলাম চর্চা একসাথে যায় না।

এছাড়া স্বাভাবিকভাবেই জামায়াতের নেতৃত্বে কোনো জোট টিকতে পারবে না বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক সহকারী। তিনি বলেন, নির্বাচনে মাওলানা মামুনুল হকের আসন বের করে নিয়ে আসতে না পারায় ১১ দলীয় জোটের প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীদের ভিতরে একটা তীব্র ক্ষোভ আছে। নরেন্দ্র মোদির আগমনবিরোধী আন্দোলনে পরবর্তী ঘটনার বিতর্ক এবং সারাজীবন জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দেওয়ায় মাওলানা মামুনুল হকের আসনটা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে জামায়াত নেগোসিয়েশন করেনি। বরং তাকে ডেকে নিয়ে, বলা যায় একপ্রকারে অপদস্ত করেছে। হয়তো এমন উপলব্ধির জায়গা থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ইসলামী দলগুলো জামায়াতের এই মুনাফেকির রাজনীতি থেকে তারা বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে।

রাশেদ খাঁন আরও বলেন, ১১ দলে ইতিমধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে। যেটার ভাঙন শুরু হয়, সেই ভাঙন আর কখনো রক্ষা করা যায় না। ১১ দল, ৯ দল হয়েছে, সামনে ৮ দল হবে। এনসিপির নেতাকর্মীদের ভিতরেও এক ধরনের চিন্তা আছে যে আমরা কেন বড় হতে পারতেছি না। জামায়াতের পকেটের মধ্যে ঢুকে আপনি কেমনে বড় হবেন? সব মিলিয়ে খুব শীঘ্রই এনসিপি হয়তো জামাত ছাড়বে। আজ হোক কাল হোক এনসিপিকে জামাত ছাড়তেই হবে, তা না হলে আস্তে আস্তে এই সংগঠনটা জামাতে বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আমি গিয়েছি—তিনি (আল্লামা বাবুনগরী) একজন মুরুব্বি; বাংলাদেশের যে ইসলামী সেন্টিমেন্ট, সেটার বিস্তারে তার একটা বড় ভূমিকা আছে, সে জায়গা থেকে তার দোয়ার জন্য গিয়েছিলাম। সেখানে কোনো পলিটিক্যাল আলাপ ওই অর্থে হয়নি। এমনকি আমি যাওয়ার আগেও এনসিপির নেতারা গিয়েছেন। আমি যতটুকু জানি জামায়াতের নেতারাও সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ দেননি।— মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী

রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সাত দলে ভিন্ন সুর
সমমনা ইসলামী দলে যুক্ত হতে যাওয়া দলগুলোর মধ্যে ‘সরকারপন্থী’, ‘সরকারবিরোধী’ এবং ‘সরকারপন্থী নয়’ এমন তিন ধারার দল একসাথে এলে সরকারের ব্যাপারে অবস্থান কী হবে—তা নিয়ে দুই রকম সুর লক্ষ্য গেছে। দলগুলোর শীর্ষ নেতারা একযোগে বলছেন, সরকারকে তারা সহযোগিতা করতে চান। তবে সরকারের বাইরের দল হিসেবে ‘বিরোধীদলীয়’ ভূমিকার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নমত আছে।

মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী বলেন, আপাতত ৫ ডিসেম্বর সিদ্ধান্ত হওয়া পর্যন্ত আমরা (জমিয়ত) পূর্বের অবস্থানে থাকলেও নীতিগতভাবে সবাই একসাথে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা যে জোটে বা প্ল্যাটফর্মে থাকি না কেন, দেশের স্বার্থে অবশ্যই আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব। সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়; আমাদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের শক্তিকে এক করা এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

তবে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, আমরা যারা আছি, সবাই সরকারবিরোধী। কেউ সরকারের না। আমরা চাচ্ছি সরকারবিরোধী একটা শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলার জন্য।

একই বক্তব্য বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিনের। তিনি বলেন, আমরা বিরোধী অবস্থানেই থাকব। আমাদের জায়গা থেকে সরকারকে পজিটিভ সহযোগিতা এখনো করি, ভবিষ্যতেও করব। তবে সরকারের অনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন অন্তত আমাদের দিয়ে হবে না। আমরা যদি কোথাও থাকি, সেখানে ওগুলো বাস্তবায়ন হবে না। এটা আমরা ঠিক করেই যাব।

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের তত্ত্বাবধানে এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে এই ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একটি সূত্রের দাবি, হেফাজতের এই উদ্যোগের মূল শর্তই হলো—সেখানে থাকতে হলে জামায়াত বা বিএনপির মতো অন্য কোনো বড় দলের সঙ্গে জোটে থাকা যাবে না।

এদিকে মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলছেন, বিরোধী দল মূলত সরকারকে সহযোগিতা করার জন্যই। তিনি বলেন, বিরোধী দল হিসেবে সরকারের সমস্যা, সরকারের সামনে সমালোচনার যে জায়গা আছে, সেগুলো আমরা করব। ভুল কিছু হলে সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের বলতে হবে। তবে শুধু বিরোধিতা করার জন্য জোট, এরকম না। সরকারের ভালো কাজের আমরা সমর্থনও করব। বিরোধী দল মানেই আন্দোলনমুখী কেন? বিরোধী দল মানে হলো যে আন্দোলনের যৌক্তিক যে সমস্ত জায়গা, সেখানে তো বিরোধী দল নক করবে। আর অযৌক্তিক বিরোধিতা করলে হবে না। সরকারকে তো সহযোগিতা করতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।