Image description

মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি দেশব্যাপী বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এতে ক্ষমতাসীন বিএনপির অভ্যন্তরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। দলের একাংশ বিষয়টিকে ‘জবাবদিহি’ ও ‘শৃঙ্খলা’র ক্ষেত্রে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখলেও অন্য অংশ এর নেপথ্যে ভিন্ন কোনও কৌশল থাকতে পারে বলে মনে করছেন। এক্ষেত্রে তারা ঢাকা নগরীর আসন্ন মেয়র নির্বাচনে আগেভাগেই তার ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

তারা বলেন, আসলে ইশরাক হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হওয়া। কারণ তার বাবা সাদেক হোসেন খোকাও অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন। তার ক্লিন ইমেজ ও পরিচিতির কারণে মাঠ পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই ইশরাককে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান।

তাই রাজনীতিতে নামার পরপরই ইশরাক হোসেন নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছিলেন। নগরীর অলিগলি বিচরণ করেন তিনি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে নিজের পক্ষে হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর তার তখনকার তৎপরতা সেই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতের প্রার্থী ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এবং এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর মতো তরুণ প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপিতে ইশরাক হোসেনকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে ভাবছে এই পক্ষটি।

যদিও এর বাইরেও বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম ও বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন।

অবশ্য ইশরাকের সমর্থকরা মনে করেন, বিএনপির সম্ভাব্য অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা স্বাধীনভাবে গণসংযোগ করতে পারছেন। আবার বিরোধী দল থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীরাও উন্মুক্তভাবে কাজ করতে করছেন। সেক্ষেত্রে ইশরাক মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার পর নিয়মের ব্যত্যয় করতে পারেননি। এখন যেহেতু তার বড় কোনও দায়িত্ব নেই, তাই তিনি এখন থেকে নিজের মতো করে কাজ করতে পারবেন। মূলত তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ সুগম হলো।    

সেই দৃষ্টিকোণ তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরানো বিএনপির হাইকমান্ডের এক ধরনের কৌশলও থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা। অবশ্য প্রকাশ্যে ইশরাকের অবস্থানকে সমর্থন করলেও অনেকে সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে অভিযান চালানোর বিষয়টি নিয়ে তর্কবিতর্ক করেছেন।

এ ধরনের ধারণা আসলে কতটুকু সঠিক, এমনটি জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে এ ধরনের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কথা বলা কঠিন। তবে ইশরাককে নিয়ে কতিপয় গণমাধ্যমের দ্বিচারিতা স্পষ্ট। কারণ তার মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে প্রথম দিন ব্যাপক সমালোচনা করা হলেও দ্বিতীয় দিন ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে।’

তার পদত্যাগ নিয়ে ভিন্ন কোনও কৌশল থাকতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তার সমর্থকরা সেই ধারণা করতেই পারেন। আবার সাধারণ জনগণের কেউ কেউ সেভাবে মূল্যায়নও করতে পারেন।’’

আ ন ম সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার মতে শুধু ইশরাকই নয়, যে কেউই নিজেকে একটি জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতে পারেন। এটা দোষের কিছু নেই। ইশরাকের পদত্যাগের নেপথ্যে আসলে কী হয়েছে, তা নিশ্চয়ই সময়ই বলে দেবে।

যে কারণে ইশরাককে পদত্যাগ করতে হলো

‘আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন’ করে গত ১৭ অক্টোবর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইন সংলগ্ন একটি বস্তিতে ‘মাদকের আস্তানায়’ পুলিশ সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালান ইশরাক।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য সমালোচনার মুখে তিনি ভিডিওটি ডিলিটও করে দেন। তবে এর মধ্যে তার হাজার হাজার কপি বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা কি অস্ত্র হাতে এভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন?

এ ঘটনায় তীব্র সমালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেন। পরে সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান ইশরাক। তার পদত্যাগের খবরে সরকার কিছুটা দায়মুক্তি পেলেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। তবে পদত্যাগের দিনই প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক বার্তা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন নিয়ে ইশরাকের আগ্রহের জায়গা ফের আলোচনায় এসেছে।

আরও বৃহত্তর দায়িত্ব পাচ্ছেন ইশরাক?

ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনা ও আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপির অভ্যন্তরে নানা আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিমন্ত্রীর পদে থেকেও জনসমক্ষে  পিস্তল প্রদর্শনের ঘটনা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

আবার আরেকটি পক্ষের দাবি, তার উদ্যোগ রাজধানীবাসীর কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তারা মনে করেন, তার উদ্দেশ্য যে ভালো ছিল, এ নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ নেই। বিরোধীদলের নেতাকর্মীরাও তার প্রশংসা করেছে। তবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে—এই শঙ্কায় ইশরাকের পদত্যাগ করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি তো তরুণ প্রজন্মের আইডল। পুরান ঢাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে তার বাবার যে ত্যাগ, তা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখনও তার কাজ করার অবারিত সুযোগ আছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ঢাকাবাসী নিশ্চয়ই তাকে সাদরে গ্রহণ করবেন। ভবিষ্যতে হয়তো তার জন্য আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনও এমনটি মনে করেন। মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগকে ঐতিহাসিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) নিজে ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি লেখেন—ইশরাকের এ পদত্যাগ কোনও অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং ভবিষ্যতে তার জন্য আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই ইশরাককে পদত্যাগ করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মেয়র প্রার্থী করার কৌশল হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে যে প্রচারণা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কবে হবে, এটা এখনও বহু দূর। বিএনপি এমনটি চাইলে তো নির্বাচনের তফসিল হওয়ার আগমুহূর্তেও তাকে পদত্যাগ করতে বলতে পারতেন।’

সেলিমা রহমান বলেন, ‘ইশরাক উদীয়মান ছেলে। চাইলে তার আরও কাজ করার সুযোগ আছে। দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকা পালন করলে তো ভবিষ্যতে তার ওপর আরও বড় দায়িত্বও আসতে পারে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, এখানে দল কয়েকটা অংশে বিভক্ত। বিশেষ করে বর্তমান প্রশাসক মো. আবদুস সালাম এবং বিএনপি নেতা ইশরাকের মধ্যে তেমন একটা মিল নেই। অন্যদিকে মির্জা আব্বাস ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের একটা পক্ষ আছে। সব মিলিয়ে এই বিভক্তি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে বিরোধী দল এই সুযোগটা লুফে নেবে।

তিনি আরও বলেন, আবদুস সালাম প্রশাসকের চেয়ারে বসেই মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে ইশরাক মন্ত্রিত্ব সামলাতে গিয়ে কিছুটা বেগ পাচ্ছিলেন। এবার তিনি পুরোদস্তুর মাঠে নামবেন। যদিও মেয়র নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন কে পাবেন, তার ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। কিন্তু আগেভাগেই তো মাঠে গোছাতে হবে। ইশরাক আপাতত সেই প্রস্তুতি নিয়ে এগোবেন।

মেয়র নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে যা বলছেন ইশরাক

এদিকে বহু আগে থেকেই দক্ষিণ সিটিতে মেয়র নির্বাচনের বাসনা পোষণ করেছেন ইশরাক হোসেন। সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণাও দিয়েছেন বেশ কয়েকবার। সম্প্রতি মেয়র নির্বাচনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য।

এমনকি পদত্যাগের পরও তিনি বলেছেন, ‘‘আমি মেয়র নির্বাচনের জন্য শতভাগ প্রস্তুত রয়েছি। যদি দলের অন্য কাউকেও প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, সে ক্ষেত্রে তাকে জেতানোর জন্যও শতভাগ প্রস্তুত আছি। আমি কোনও কিছুতেই বিচলিত হবো না। সব পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে যাবো।’’

ইশরাকের রাজনৈতিক উত্থান

৩৯ বছর বয়সী ইশরাক হোসেনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। তিনি ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র। পুরান ঢাকায় তার আধিপত্য ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল। যার কাছে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে হেরে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার মৃত্যুর পর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন ইশরাক।

আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। রাজপথের আন্দোলন, দলীয় কর্মসূচি ও জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে তরুণ নেতাকর্মীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক। সেসময় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে পরাজিত হন ইশরাক।

তবে ফল চ্যালেঞ্জ করে আইনি লড়াই করেছেন তিনি। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের পর সরকারের পটপরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও শপথ গ্রহণ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি তিনি।

এর আগে ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশে পুলিশের লাঠিপেটায় আহত বিএনপির এক কর্মীকে ছিনিয়ে নেন ইশরাক। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে নিজের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করে ইশরাক লেখেন, লাঠিচার্জ কিংবা কামানের গোলা—যে পরিস্থিতিই আসুক, জীবন থাকতে দলের কোনও কর্মী-সমর্থককে নিয়ে যেতে দেবেন না। মূলত ওই ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনে ভিন্নমাত্রা যোগ করে।