Image description

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনায় রাবি ছাত্রদলের ৭ জন নেতাকর্মীর নাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন- শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব ও শরিফুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, তাকবীর আহমেদ ইমন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসান, সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথী ও ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী।

অভিযুক্ত ৭ জনের মধ্যে সরাসরি সাংবাদিকদের পিটিয়েছে এমন ৩ জনকে শনাক্ত করেছে বেঙ্গল লেন্স।

তারা হলেন, রাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী হাসিব হাসান এবং ছাত্রদল কর্মী ও অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী।

হাসিবুল ইসলাম (3)

রবিবার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় যেই টি-শার্ট পরিহিত ছিলেন রাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব, একই টি-শার্ট গায়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন তিনি।

 

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসান সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় যেই হলদে রঙের জুতা (লেদার শু) ছিলেন, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর হাসিব হাসানের ফেসবুক পোস্টে দেওয়া একটি ছবিতেও একই জুতো পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে।

ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী সাংবাদিকদের হামলার সময় ডানহাতে একটি কালো ব্রেসলেট দেখা যায়, একই ব্রেসলেট পরিহিত অবস্থায় তাকে দেখা গেছে গত ২৮ জুলাই তার আইডিতে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে। এছাড়া হামলার সময় বিশাল চক্রবর্তীর পায়ে থাকা সাদা রঙের জুতার (স্নিকার্স) সাথেও মিল রয়েছে গত ১ মার্চ ফেসবুক পোস্টে দেওয়া একটি ছবির সাথে।

দুইটি ভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বেঙ্গল লেন্স এই তিনজনকে শনাক্ত করেছে। যার একটি ভিডিওতে দেখা যায় আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামকে স্টিলের ফোল্ডিং স্টিক দিয়ে পেটাচ্ছিলেন রাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব। এবং অন্য ভিডিওটিতে দেখা যায় দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুলকে পেটাচ্ছিলেন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসান ও ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী।

অভিযু্ক্তদের শনাক্তের পর হামলায় আহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমকালের প্রতিনিধি মাইনুল ইসলাম রাজু বেঙ্গল লেন্সকে হামলায় এই তিনজনের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া অন্য অভিযুক্তদের কোনো ভিডিও ফুটেজ বা প্রমাণ আছে কি-না জানতে চাইলে রাজু জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফুটেজ ডিলিট করে দিয়েছেন।

 

হামলার সাফাই গাইছেন অভিযুক্ত ৩ ছাত্রদল নেতাই

অভিযুক্ত রাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব হামলার পরপর রবিবার রাত ১১টার দিকে ফেসবুক দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, “কোন নিরপেক্ষ সাংবাদিকের ওপর হামলা করা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তিকারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, জিয়া হলের জিএস আরিফুলকে ধরতে জিয়া হলে গেলে সংক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের উপর যেসব সাংবাদিক নামধারী গুপ্ত শিবির ছানা হামলা করতে এসেছে তাদেরকে প্রতিহত করা হয়েছে মাত্র।”

117

অভিযুক্ত ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসান ৫ অক্টোবর দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি ভিডিও শেয়ার দেন। ভিডিওতে ছিল রাবি সাংবাদিকদের মারধরের দৃশ্য, যার ক্যাপশন ছিল “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরকে ধোলাই কম দেওয়া হয়েছে এর তীব্র নিন্দা জানাই।” পোস্ট শেয়ার করে হাসিব হাসান লিখেছেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের লোডই সামলাতে পারলেন না।”

116

ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী ৪ অক্টোবর রাত ২টা ৪১ মিনিটে দেশটিভির “রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, চার সাংবাদিকসহ আহত ১০” শিরোনামের একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে লিখেছেন, “রাবিতে কোন সাংবাদিকের উপর হামলা হয় নাই, সাধারন শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে গুপ্ত সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করেছে রাবি ছাত্রদলের সহ সভাপতি এম আহসান হাবিব।” সেই পোস্টে তিনি রাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আমান উল্লাহ আমানকে ট্যাগ করেছেন।

118

 

আমান উল্লাহ আমানকে ট্যাগ করার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এই নেতার সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী সেই তিন ছাত্রদল নেতারই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ছবি রয়েছে। এছাড়া আমান উল্লাহ আমানের সঙ্গে একাধিক গ্রুপ ফটোও রয়েছে হামলাকারীদের।

হাসিবুল ইসলাম (8)

 

ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী বেঙ্গল লেন্সের কাছে সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “এই সাংবাদিকরা কেউ তাদের পরিচয় দেয়নি। উল্টো আমাদের ওপর মব করার চেষ্টা করে। তাই আত্মরক্ষার্থে আমরা তাদের গায়ে হাত তুলেছি। এটা একটা মিস আন্ডার্স্ট্যান্ডিং ছিলো। এছাড়া হাসিব হাসান ও আহসান হাবিবও একই কারণে মেজাজ হারিয়েছেন বলে বেঙ্গল লেন্সকে জানান তিনি।

 

প্রসঙ্গত, গতকাল রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামকে আক্রমণের উদ্দেশে আসা ছাত্রদল নেতাকর্মীদের কাছে দেশীয় অস্ত্র দেখে ফুটেজ সংগ্রহ করতে আসেন সাংবাদিকরা। এসময় ছাত্রদলের হামলায় ৪ সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহত সাংবাদিকরা হলেন- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবান, আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল ও দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু। এছাড়া আরও কয়েকজন সাংবাদিক মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

হামলায় আহত আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকদের সবাইকে চেনেন। আমরা কারা, কোথায় কাজ করি, কোন সংবাদ নিয়ে কাজ করি—এসব তাদের অজানা নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, দখলদারি, মারধর, হুমকি কিংবা নানা অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ করায় তাদের একটি অংশের মধ্যে সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ ও আক্রোশ তৈরি হয়েছে।

 

সাংবাদিকরা যখন ক্যামেরা হাতে কোনো ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণ করেন, তখন তিনি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অবস্থান নিতে যান না; তিনি তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু গতকাল সাংবাদিকরা যখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতে দেশীয় অস্ত্র দেখতে পেয়ে তার ফুটেজ ধারণ করতে এগিয়ে যান, তখনই আমাদের ওপর হামলা শুরু হয়। সহকর্মীদের উপর হামলার খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গেলে আমাকে মারধর করা হয়। এসময় তারা "আরও একটা সাংবাদিক পেয়েছি" উল্লেখ করে আমার উপর অতর্কিত হামলা করে। দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আমার মাথা, পা এবং হাতে মর্মান্তিকভাবে আঘাত করা হয়।”

 

জড়িতদের পরিচয় জানলেও অজ্ঞাতদের নামে মামলা

এদিকে ৫ অক্টোবর রাবির শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিষ্ট্রার মো. মনির হোসেন বাদি হয়ে মতিহার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। জড়িতদের পরিচয় জানলেও মামলার এজাহারে হামলাকারীদের ‘অজ্ঞাতনামা কয়েকজন শিক্ষার্থী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসিবুল ইসলাম (10)

 

এ বিষয়ে ডেপুটি রেজিষ্ট্রার মো. মনির হোসেন বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “আমি হলাম ছায়া বাদি। অর্থাৎ, অফিসার হিসেবে আমাকে স্যাররা যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমি সেই আলোকে মামলার এজাহারে সবকিছু উল্লেখ করেছি।”

এ বিষয়ে রাবি প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করে বেঙ্গল লেন্স। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগপর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে হামলায় আহত আগামীর সময়ের রাবি প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “গতকালের হামলার ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত, কার নির্দেশে হামলা হয়েছে—এসব এখন আর আমাদের কাছে অস্পষ্ট নয়। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ছবি ও ভিডিও ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। ফলে ঘটনাটি তদন্তের নামে ‘অজ্ঞাতনামা’ মামলা করে বিষয়টিকে দীর্ঘসূত্রতায় ঠেলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদের হাতে যখন হামলাকারীদের পরিচয় ও ঘটনার দৃশ্যমান প্রমাণ রয়েছে, তখন অজ্ঞাতনামা মামলা করে তদন্তের নামে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা কার্যত আমাদের হাতে ‘মুলা ঝুলিয়ে দেওয়ার’ মতোই। আমরা এমন কোনো প্রক্রিয়া চাই না, যেখানে মামলা হবে, তদন্ত হবে—কিন্তু হামলাকারীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থেকে যাবে।

আমরা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট দাবি জানাই—হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; মামলায় সুনির্দিষ্ট আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”