জাতীয় রাজনীতিতে সাফল্য কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেক দলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠের সংগঠনকে শক্তিশালী করা। কোথাও মনোনয়নকেন্দ্রিক বিরোধ, কোথাও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, আবার কোথাও পুরনো-নতুনের সংঘাত ও সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা দলগুলোর অভ্যন্তরীণ চিত্রকে জটিল করে তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন হালচাল নিয়ে আগামীর সময়ের ধারাবাহিক আয়োজন—
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়ন নিয়ে যে বিরোধ, ভোটের মাঠে বিদ্রোহ এবং পরে বহিষ্কার— সে ক্ষত এখনো শুকায়নি বিএনপিতে। দল ক্ষমতায় এলেও তৃণমূলে ফেরেনি পূর্ণ ঐক্য। মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের অনেকে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তার মধ্যে অনেকে নির্বাচনে জয়ীও হয়েছেন। ফলে বহিষ্কারাদেশ থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অটুট রয়েছে।
মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নেতারাও নিজ নিজ বলয় ধরে রেখেছেন। তাদের অনুসারীরা এখনো দলীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি পৃথকভাবে সক্রিয়। কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থীকে ঘিরে, কোথাও উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক গ্রুপ। জাতীয় নির্বাচনের সময়ের এই বিভক্তি এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দলীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্ধশতাধিক আসনে মনোনয়নবিরোধের রেশ এখনো রয়েছে। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট করায় কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের পাশাপাশি তাদের সমর্থন করায় প্রায় ৫০০ নেতাকর্মীকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশ এখনো দলে ফিরতে পারেননি।
আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হতে যাওয়া এই ভোটে দলীয় প্রতীক না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে চারজন করে নেতা প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের লোককে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়নবিরোধ নিরসন না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে, যেসব এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন বা শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছেন, সেখানে দলীয় সমর্থিত প্রার্থীকে ঘিরে ঐক্য করা কঠিন হতে পারে।
বহিষ্কৃতদের ঘিরে পৃথক বলয়: পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন এর অন্যতম উদাহরণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেয় বিএনপি। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হাসান মামুন। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন তিনি। দল তাকে বহিষ্কার করে। নির্বাচনের সময় বিএনপির একটি অংশ নুরের পক্ষে কাজ করে। নুর নির্বাচনে জয়ী হন। বর্তমানে তিনি সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী। তবে হাসান মামুন বহিষ্কৃত থাকলেও গলাচিপায় বিএনপির একটি অংশ এখনো তাকে ঘিরেই সক্রিয়। তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিও উঠেছে। অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব এবং নুরকে কেন্দ্র করে সেখানে পৃথক রাজনৈতিক বলয় রয়েছে। দশমিনা উপজেলায় এখনো বিএনপির কোনো কমিটি নেই।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের চিত্রও একই। এখানে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। নির্বাচনের আগে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবিতে ফিরোজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় তিনি বহিষ্কৃত হন। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির বড় একটি অংশ এখনো তার সঙ্গে রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে রাশেদ খান ও হামিদুল ইসলাম হামিদকে ঘিরে রয়েছে আরেকটি গ্রুপ। হামিদ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। দলের সাবেক এমপি প্রয়াত শহীদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মুর্শিদা জামানও সেখানে পৃথক একটি বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
নাটোর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন ফারজানা শারমীন। অন্যদিকে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন দলের কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। দল তাকে বহিষ্কার করে। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ এখনো টিপুর সঙ্গেই রয়েছে। ফারজানা শারমীন নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বর্তমানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
টাঙ্গাইল-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির। অন্যদিকে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ। বহিষ্কৃত হলেও নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ এখনো তার সঙ্গে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে ভোট করেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। অন্যদিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে তার পক্ষে কাজ করে। দল বহিষ্কার করলেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইকবাল। অনুসারীদের অনেকে এখনো তার সঙ্গেই রয়েছেন।
বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে ধীরগতি: দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের অর্ধশতাধিক নেতার পাশাপাশি তাদের সমর্থন করায় প্রায় ৫০০ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। দলে ফিরতে তাদের অনেকেই আবেদন করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তৃণমূলের মাত্র ছয়জনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত আগস্টের প্রথমদিকে কেন্দ্র থেকে নড়াইল সদর, পৌর ও লোহাগড়া বিএনপির ছয় নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বাকিদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে বহিষ্কৃত নেতাদের অনেকেই সাংগঠনিকভাবে দলের বাইরে থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন।
প্রকাশ্যে কোন্দল: বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় নেতৃত্বের আধিপত্য এবং নতুন-পুরনো কর্মীদের দ্বন্দ্বও তৃণমূলের কোন্দল বাড়িয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে অন্তত পাঁচটি জেলায় সংঘাতের ঘটনা সামনে আসে। বরিশাল, পটুয়াখালী, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। পটুয়াখালীর গলাচিপায় অর্ধশতাধিক এবং মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অন্তত ২৫ জন আহত হন। দলীয় নেতাদের অনেকে মনে করছেন, এসব ঘটনা তৃণমূলের বিভক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। স্থানীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিরোধ তত বাড়তে পারে।
স্থানীয় নির্বাচন হবে বড় পরীক্ষা: ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হতে যাওয়া এই ভোট বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের ধারাবাহিকতা স্থানীয় নির্বাচনেও ধরে রাখতে চায় দলটি। এ কারণে কয়েক মাস ধরে জেলা নেতাদের নিয়ে সাংগঠনিক বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি তৃণমূল নেতাদের সবপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে একক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকেই দল সমর্থন দেবে। দলীয় সমর্থন পেলেও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে প্রার্থীকে বিজয়ী হয়ে আসতে হবে বলে নেতাকর্মীদের জানানো হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সংশ্লিষ্ট সবপক্ষ ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করছেন। তাদের বার্তা একটাই— দল যাকে সমর্থন দেবে, শেষ পর্যন্ত সবাইকে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও এ বিষয়ে অঙ্গীকার করছেন। তবে মাঠপর্যায়ে এই অঙ্গীকার কতটা কার্যকর হবে— সেটিই এখন প্রশ্ন।
বহিষ্কৃতরা কি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে থাকবেন?: বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা বহিষ্কৃত নেতাদের অবস্থান নিয়ে। তারা কি দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন, নাকি নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে পৃথক অবস্থান নেবেন— তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিগত নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট করে বহিষ্কৃত বিএনপির সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতা বললেন, ‘আমার সঙ্গে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রয়েছেন। তারা ভোট করবেন। এমনকি ইউপি সদস্যপদেও আমাদের প্রার্থী থাকবেন। দল তো আমাদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় আসেনি যে, আমরা ছাড় দেব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে আমরা প্রার্থী দেব।’
তার এ বক্তব্যে বহিষ্কৃত নেতাদের একটি অংশের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তারা এখনো নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বললেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
তার ভাষ্য, বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় দলের অনেকেই নির্বাচনে আগ্রহী হতে পারেন। তবে সবাইকে নিয়ে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষ যাকে পছন্দ করেন না, এমন কাউকে সমর্থন দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিগত নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা নির্বাচন করেছিলেন এবং তাদের যারা সমর্থন করেছিলেন, তারাও এবার দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষেই থাকবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রিন্স আরও বললেন, ‘তারা এরই মধ্যে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। দলে ফিরতে অনেকেই ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন। আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভূমিকা দেখেই দল আবেদনের বিষয় বিবেচনা করবে।’