Image description

রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান ও আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার পেছনে জমি-জমা বিরোধসহ নানা কারণ রয়েছে। পাশাপাশি উঠেছে চাঁদাবাজির অভিযোগ।

জানা গেছে, এলাকার জমির নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা হাত মিলিয়েছেন।

আবাসন প্রকল্পের জমি নিয়ে এই এলাকায় আগেও কয়েক দফা হামলা ও সংঘর্ষ হয়েছে। দখল ও পাল্টা দখল নিয়ে প্রায়ই সংঘাত বাঁধে। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় কয়েকটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা হয়েছে। পুলিশ সেগুলো তদন্ত করছে।

‘নিউ গিনি প্রোপার্টিজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘অনলাইন গ্রুপ’ নামের আরেকটি আবাসন কোম্পানির দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। পুলিশ কয়েক বছর ধরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।

গত শনিবার নিউ গিনি আবাসন প্রকল্প ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের পর দুই কোম্পানির পুরোনো বিরোধটি আবার সামনে এসেছে।

গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান টাইমসকে বলেন, ‘মানিকদী ও আশপাশের এলাকা দ্রুত শহর হিসেবে গড়ে উঠছে। ফলে এখানে অনেক আবাসন প্রকল্প হয়েছে। জমি নিয়ে বিরোধের কারণে এসব কোম্পানির মধ্যে মারামারি ও হামলা হচ্ছে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আবাসন প্রকল্প নিয়ে অনেক অভিযোগ পুলিশ তদন্ত করছে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর নিউ গিনি প্রকল্প এলাকায় অন্তত তিনবার হামলা ও সংঘর্ষ হয়েছে। জমি দখল ও পাল্টা দখলকে কেন্দ্র করেই এসব সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এর পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা রয়েছেন বলে তাদের দাবি।

গত শনিবার রাতের হামলার ঘটনায় করা মামলায় বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে।

ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) সুব্রত দেবনাথ মঙ্গলবার টাইমসকে জানান, পুলিশ ইতিমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের নাম এজাহারে রয়েছে। একজনকে তদন্তের পর শনাক্ত করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারদের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি জানান, ১ নম্বর আসামি শাহরিয়া মাহমুদ একজন মাদ্রাসাশিক্ষক। তিনি একসময় প্রজন্ম লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২ নম্বর আসামি আবুল কাশেম ক্যান্টনমেন্ট থানা জামায়াতের সঙ্গে জড়িত। ৯ নম্বর আসামি মিজানুর রহমান কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আবদুল গফুরের জামাতা। তিনি স্থানীয় জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয়।

শাহ আলম অনীক মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভাসানটেক থানা যুবলীগের সহসভাপতি। হামলায় অংশ নেওয়া ইব্রাহিমসহ কয়েকজন স্থানীয় যুবদল কর্মী হিসেবে পরিচিত।

হামলায় যুক্ত বাকিদের সাধারণ নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা ভাসানটেক বস্তিতে থাকেন।

আগের হামলা ও পাল্টা হামলা

মানিকদীর কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত শনিবার রাতে নিউ গিনিতে হামলার আগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও এলাকায় জমি দখলের অভিযোগ ছিল। রাস্তা বন্ধ করে জমির মালিকদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

 

নিউ গিনির চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া আরজু জানান, সালমান মুক্তাদিরকে চার বছরের চুক্তিতে জমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তিনি ১০ কাঠা জমি কিনলেও কিছু লোক দখল ছাড়েনি। তারা জমি নিজেদের কব্জায় রেখেছে।

নাজিম উদ্দিনের দাবি, তারা বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, গত শনিবার রাতের হামলার আগে তাদের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা চাওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি জিডিও করেছিলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, এই ঘটনার সঙ্গে ‘অনলাইন গ্রুপ’ নামের কোম্পানির যোগসাজশ রয়েছে।
তবে অনলাইন গ্রুপের কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুর রহমান বলেন, নিউ গিনির সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও হামলার সঙ্গে তারা যুক্ত নন। কয়েকটি প্লট দখল হয়ে যাওয়ায় আদালতে মামলা চলছে বলেও জানান তিনি।

ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ জানায়, নিউ গিনির মালিকদের নামে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মামলা রয়েছে। চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনের নামেও পাঁচটি মামলা রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নিউ গিনি ও অনলাইন গ্রুপের মধ্যে জমি নিয়ে পুরোনো বিরোধ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাতে নিউ গিনি হাউজিংয়ের ভেতরে অনলাইন গ্রুপের একটি স্থাপনা নিয়ে ঝামেলা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের কার্যক্রম কিছুটা স্থবির থাকার সুযোগে হামলাকারীরা ওই ঘটনা ঘটায়। পরে পুলিশ তদন্তে নামলে অনলাইন গ্রুপের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে।

 

অনলাইন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঢাকা উত্তরের সহসভাপতি। সূত্র জানায়, তিনি আত্মগোপনে থাকার সুযোগে নিউ গিনির মালিক ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে অনলাইন গ্রুপের জমি দখল করে নেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন র‌্যাব, বর্তমানে এসআরবি, আকতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে। এরপর নিউ গিনি ওই এলাকায় অনলাইন গ্রুপসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিতর্কিত জমিগুলো দখলে নেয়।

সূত্র জানায়, অনলাইন গ্রুপের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এতে তারা ওই জমিগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে অনলাইন গ্রুপ ও নিউ গিনির বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ মানিকদী গ্রামে যাতায়াতের রাস্তার পাশে নিউ গিনি একটি মসজিদ ও শ্রমিকদের থাকার ঘর নির্মাণ করে। এরপর স্থানীয়রা সেখানে হামলা চালায়। এ ঘটনায় একটি অভিযোগ এখনো ক্যান্টনমেন্ট থানায় রয়েছে।

নিউ গিনি প্রকল্পের ভেতরে অনেক স্থানীয় বাসিন্দার বাড়ি রয়েছে। প্রকল্পের ভেতরের রাস্তা ব্যবহার নিয়ে তাদের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ চলছে। ইসিবি চত্বরের কাছে নিউ গিনির ১ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে নামাপাড়ার ৪ নম্বর গেট দিয়ে বের হওয়া যেত। নিউ গিনি কর্তৃপক্ষ ১ নম্বর গেটটি বন্ধ করে দেওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

 

কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গেট বন্ধ থাকায় তাদের এখন অনেকটা পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

তবে নাজিম উদ্দিনের দাবি, তারা রাস্তা বন্ধ করেননি। শুধু প্রকল্পের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘মানিকদী ও মাটিকাটায় বেশ কিছু আবাসন প্রকল্প আছে। এগুলো নিয়ে নানা ঝামেলা চলছে। পুরোনো বিরোধগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনলাইন গ্রুপ ও নিউ গিনির দ্বন্দ্বের বিষয়টিও তদন্তাধীন।’

হামলার নেপথ্যে ৪৩ কাঠা জমির বিরোধ

তদন্তে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মানিকদীতে ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে মূল বিরোধ। একটি পক্ষের দাবি, নিউ গিনির লোকজন জমি দখল করে ঘরবাড়ি বানিয়েছে। তাই তারা জমি উদ্ধারে গিয়েছিল।

এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ১ নম্বর আসামি শাহরিয়া মাহমুদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। দখল হওয়া জমি উদ্ধার করতে পারলে তাকে পাঁচ কাঠা জমি দেওয়া হবে। সেই লোভে শাহরিয়া জমিটি দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

এ জন্য লোক জড়ো করতে সাহায্য করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ নেতা শাহ আলম অনীক। ভাসানটেক বস্তির মুন্না, মামুন ও আসলাম নামের এক অটোরিকশাচালক ভাড়ায় লোক এনে হামলায় অংশ নেন।

নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে নিউ গিনির জায়গা দখলের পাঁয়তারা করছিল।

নাজিম উদ্দিন বলেন, তারা ৩৫ কাঠা জমি বিক্রি করেছিলেন। এখন প্রতিপক্ষ সেটি জোর করে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর বাইরে আরও আট কাঠা জমি রয়েছে।

 

তিনি জানান, চলাচলের রাস্তা না থাকায় ওই জমির দাম ছিল কাঠাপ্রতি ২০ লাখ টাকা। হামলার পেছনে অনলাইন গ্রুপের হাত রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও জানান, আদালত থেকে জামিন পেয়ে অনলাইন গ্রুপের প্রধান আকতারুজ্জামান আবার সক্রিয় হয়েছেন। তিনি মোহাম্মদপুরে অফিস খুলে কাজ চালাচ্ছেন।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে কয়েকবার চেষ্টা করেও আকতারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।