Image description

দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট, পদায়নে অনিশ্চয়তা, জনবল সংকট ও পেশাগত হতাশা কাটাতে পুলিশে একগুচ্ছ প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চাকরির নির্ধারিত সময় পার হলেও পদ শূন্য না থাকায় পদোন্নতি আটকে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত আলোচনা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ‘ফিট লিস্ট’ তৈরির চিন্তাভাবনা চলছে।

এছাড়া মাঠপর্যায়ে জনবল বাড়াতে ১৮ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির পরিকল্পনা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পুলিশের ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা ও অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের হতাশা কাটানোর ক্ষেত্রে উদ্যোগগুলোর বাস্তব প্রয়োগই হবে মূল পরীক্ষা।

আমার দেশ-এ গত ৩ আগস্ট ‘পদোন্নতি জটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পুলিশে হতাশা’ শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। এরপর বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) সভা, পুলিশ সদর দপ্তরে ধারাবাহিক বৈঠক এবং সরকারের পক্ষ থেকে কাঠামোগত সংস্কারের ঘোষণা আসার পর বাহিনীর ভেতরে স্বস্তি ও নতুন কর্মস্পৃহা ফেরার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শুধু সাময়িক পদোন্নতি দিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব নয়। এজন্য ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতদিন পুলিশের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে তাদের পেশাগত বৈষম্য। প্রশাসন ক্যাডারে নির্দিষ্ট মেয়াদ ও যোগ্যতা পূরণ হলে শূন্যপদ না থাকলেও পদোন্নতির বিধান রয়েছে, যা পুলিশে এতদিন অনুপস্থিত ছিল। ফলে পদমর্যাদার সীমাবদ্ধতায় বছরের পর বছর এক জায়গায় আটকে থেকে শত শত কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চনার শিকার হচ্ছিলেন। এই বৈষম্য নিরসনে প্রশাসন ক্যাডারের আদলেই ব্যাচভিত্তিক প্রথা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ চাকরির নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং পারফরম্যান্স সন্তোষজনক হলে পদ খালি না থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে চরম বঞ্চনার শিকার হওয়া বিভিন্ন ব্যাচের পদোন্নতির জট ছুটাতে এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ১৫তম ব্যাচের ১২ জন এখনো পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ১৭তম ব্যাচের ৪৯, ১৮তম ব্যাচের ৫৫ এবং ২০তম ব্যাচের ১০৬ কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের সময়ে ২০তম ব্যাচ পর্যন্ত বেশির ভাগ ডিআইজি হয়ে গেলেও এরপর থেকে অন্য ব্যাচগুলোর ক্ষেত্রে পদোন্নতির বঞ্চনা এখনো শেষ হয়নি।

সবচেয়ে অসমতা তৈরি করা হয়েছিল ২১, ২২ ও ২৪তম ব্যাচের ১১ জনের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে ২১ ব্যাচের অন্য সহকর্মীরা অতিরিক্ত ডিআইজি পদে গেলেও রাজনৈতিক অসংগতির কারণে তিন কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর জুনিয়রদের অধীনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে চাকরি করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এছাড়া ২২তম ব্যাচের তিনজন এবং ২৪তম ব্যাচের পাঁচজন একই ধরনের বৈষম্যের শিকার হন।

জানা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচ পর্যন্ত যুগ্ম সচিব (পুলিশের ডিআইজির সমমান) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অনেকে সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ পুলিশে ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তারা এখনো যুগ্ম সচিব সমমানে ডিআইজি হিসেবেই রয়ে গেছেন। এখনো ১৫ ও ১৮ ব্যাচেরও অনেকেই অতিরিক্ত আইজিপি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

 

‘ফিট লিস্ট’ ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি

বদলি ও পদায়নে তদবির প্রথা বন্ধে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। যোগ্য, দক্ষ ও ভালো ট্র্যাক রেকর্ডধারী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বেছে নিতে প্রবর্তন করা হচ্ছে ‘ফিট লিস্ট’ বা বাছাই তালিকা। স্বচ্ছতার সঙ্গে পদায়ন করতে দুটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে কমিটি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে এর ওপরের স্তরের কর্মকর্তাদের ব্যাচ, কাজের রেকর্ড ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে পদায়নের ফিট লিস্ট তৈরি করবে। আরেকটি কমিটি পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও বদলির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করবে।

নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—তালিকা কীভাবে তৈরি হবে এবং বাস্তবে সেটি কতটা অনুসরণ করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অতীতে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নানা ধরনের তদবিরও পদায়ন-পদোন্নতিতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে ফিট লিস্ট ব্যবস্থা কার্যকর হলে তার স্বচ্ছতা ও মানদণ্ডই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

পদোন্নতি দৃশ্যমান

পুলিশের পদোন্নতির প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। গত ২৩ আগস্ট পাঁচ ডিআইজিকে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে শুধু ওপরের সারির কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চাপ কমানো সম্ভব নয়। এজন্য কনস্টেবল থেকে পরবর্তী ধাপের পদোন্নতির প্রক্রিয়াও নিয়মিতভাবে চলমান রয়েছে।

 

জনবল সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা

জনবল সংকট মোকাবিলায় আরো বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুলিশে আরো ১৮ হাজার সদস্য নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪,০০০ নিরস্ত্র সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই), ৪,০০০ সার্জেন্ট এবং ১০ হাজার কনস্টেবল। এর আগে সাড়ে ১৪ হাজার নতুন নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও নতুন পরিকল্পনায় সার্জেন্টের পদ যুক্ত হওয়ায় জনবল কাঠামো আরো প্রসারিত হয়েছে।

 

পূর্ণাঙ্গ সাইবার ইউনিট ও নৈতিক প্রশিক্ষণ

আধুনিক অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরা এখন প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। ডিজিটাল জালিয়াতি, সাইবার বুলিং, আর্থিক অপরাধ ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ মোকাবিলায় একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে বিশেষায়িত ‘পূর্ণাঙ্গ সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালনা বোর্ডের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সাইবার ইউনিট গঠনের পাশাপাশি প্রকৌশল, আইটি ও কম্পিউটার সায়েন্সে দক্ষ পুলিশ সদস্যদের কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়।

পুলিশ স্টাফ কলেজে ফরেনসিক সায়েন্স এবং ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিষয়ে উচ্চতর কোর্স চালুর বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে অপরাধ দমনে সফলতার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মানবিক ও নৈতিক মানোন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ একাডেমিগুলোর সিলেবাসে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানবাধিকার, জবাবদিহি, সাইবার ফরেনসিক এবং পেশাগত নৈতিকতার পাঠ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণকে পদোন্নতি ও পদায়নের অগ্রাধিকার শর্ত হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়েও কাজ চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং জনগণের জনকল্যাণমূলক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ রয়েছে। ক্রমান্বয়ে সেসব বাস্তবায়ন করা হবে।