Image description

গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন ছাত্রদলের হামলায় এক চোখ হারানো জাতীয় ছাত্রশক্তির হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সদস্য সচিব আলিফ চৌধুরী। তার বক্তব্যের একটি ছোট ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন পেইজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হচ্ছে, দুই চোখ অন্ধ হওয়ার পরও আলিফ দেখে দেখে লিখিত বক্তব্য পড়ছেন। এদিকে আওয়ামীপন্থীদের ছড়ানো এই ভিডিওটি  প্রচার করতে দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিপন্থী বিভিন্ন পেইজ, অ্যাকাউন্ট এবং ছাত্রদলের নেতাদের।

নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “তথাকথিত ঝুলাই যোদ্ধার দুই চোখ নাকি নাই! অথচ দেখে দেখে দিব্যি বক্তব্য দিচ্ছে! মিথ্যা আর গুজবে সাজানো গোছানো পরিকল্পিত উন্নয়নের দেশটা আজ শেষ!”

আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট কাজী মামুন ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “ছেলেটার ২টা চোখ না থাকার পরও কি সুন্দর নোট দেখে পড়তেছে!!”

আওয়ামীপন্থী পেইজ ক্রাক প্লাটুন বাংলাদেশে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “চোখ না থাকলেও স্ক্রিপ্ট দেখে পড়তে পারেন জুলাই যোদ্ধা।”

আওয়ামীপন্থী পেইজ নিউক্লিয়াস ৭১-এ ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, “প্রশ্নঃ জুলাইযোদ্ধা কাকে বলে?  উত্তরঃ চোখে না দেখেও পড়তে পারাকে জুলাইযোদ্ধা বলে।” 

আওয়ামীপন্থী পেইজ টিম ৭১-এ ভিডিওটি পোস্ট করে বলা হয়েছে, “দুই চোখ নাই অথচ দেখে বক্তব্য দিচ্ছে। জুলাই যো*দ্ধারা কতোকিছুই না দেখালো।”

আরেক আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট ট্যালেন্ট কান্তি দাশ ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “প্রতিহিংসার রাজনীতি আমার দুটি চোখ কেড়ে নিয়েছে। সে যদি অন্ধ হয় থাকে তাহলে কাগজ হাতে নিয়ে কি দেখছে। তাহলে সে কোন রকমের অন্ধ।”

 

ভিডিওটি শেয়ার দিচ্ছেন বিএনপিপন্থীরাও

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “দু চোখ অন্ধ করে দেয়া হয়েছে- এ ধরনের চরম মিথ্যাচার নিয়ে সবাই ট্রল করছেন কিন্তু তার গলায় ঝুলানো ফিতায় কেন 'জাতীয় ছাত্রদল' লিখা? এনসিপি কি দিন রাত শুধু ছাত্রদলের ভাবনাতেই নিমজ্জিত থাকে?”

এই পোস্টের বিষয়ে জানতে রাকিবের মোবাইল নম্বর এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়াও মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

ভিডিওটি শেয়ার করেছেন  জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীমউদ্‌দীন হলের আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী মায়েদ। যদিও তারা উভয়েই পরবর্তীতে পোস্টগুলো সরিয়ে ফেলেন।

এছাড়াও বিএনপিপন্থী বিভিন্ন পেইজ এবং অ্যাকাউন্ট থেকেও ভিডিওটি শেয়ার করতে দেখা গেছে।  চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি নামক একটি পেইজ থেকে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “কাগজ দেখে বক্তৃতা দিচ্ছে অথচ সে বলছে প্রতিহিংসার রাজনীতির জন্য তার দুটো চোখ কেড়ে নিয়েছে । এনসিপি দলটাই বিনোদনের।”

কলাবাগান থানা ছাত্রদল নামক একটি পেইজে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “চোখে সানগ্লাস আর হাতে কাগজ—বাহ রে রাজনীতি! ​মুখে বলি "প্রতিহিংসার রাজনীতি আমার দুটো চোখ কেড়ে নিয়েছে", আর চশমার আড়ালে সেই চোখ দিয়েই তো দিব্যি কাগজ দেখে বক্তব্য পড়ে যাচ্ছি! বাহবা দিতেই হয় এই অভিনয়ের কারিগরদের। ​চারপাশের এই ভণ্ড আর বাটপারদের মুখোশগুলো আর কতকাল লুকিয়ে রাখবেন? সাধারণ মানুষকে বোকা ভাবার দিন এখন আর নেই। মুখে এক কথা আর কাজে অন্য রূপ—এই হলো আপনাদের আসল রাজনীতি!”

ন্যাশনালিস্ট গফরগাঁও নামক বিএনপিপন্থী একটি পেইজে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “দুটো চোখ কেড়ে নেওয়ার পরেও ভাইয়া স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে পড়ছে।”

অ্যাডভোকেট সাঈদ ইসলাম নামে একজন ভিডিওটি শেয়ার দিয়েছেন। তার আইডিতে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল লেখা রয়েছে এবং বিএনপির পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট দিতে দেখা গেছে। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাকে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। 

 

ভিডিওটি সম্পাদিত

যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্পাদিত। 

ভিডিওটির কী-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ দিলে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ‘Shadhin Time’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে  সেদিনের অনুষ্ঠানে আলিফের বক্তব্যের একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়, যেটির ৬ সেকেন্ড থেকে প্রচারিত ভিডিওটির সাথে মিল রয়েছে। উক্ত ভিডিওটিতে আলিফকে বলতে দেখা যায়, “প্রতিহিংসার যে রাজনীতি, এই প্রতিহিংসার রাজনীতি আমার চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে।” এই বক্তব্যটি দেওয়ার সময় আলিফকে স্ক্রিপ্ট দেখে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে না।

এছাড়াও ভিডিওটিতে আরো দেখা যায়, আলিফের গলায় যে ফিতাটি রয়েছে সেখানে ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ লেখা। এছাড়াও তার সামনে ডায়াসে কোনো স্ক্রিপ্ট বা কাগজ দৃশ্যমান নয়। এছাড়াও ভিডিওতে জাতীয় ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফিকে আলিফের পেছন থেকে এসে কানে কানে বলতে দেখা যায়। 

প্রচারিত ভিডিওটিতে আরও কিছু অসংগতি দেখা যায়। প্রচারিত ভিডিওতে আলিফকে বলতে শোনা যায়, “প্রতিহিংসার রাজনীতি আমার দুটো চোখ কেড়ে নিয়েছে।” কিন্তু মূল ভিডিওতে তার বক্তব্য ছিল, “প্রতিহিংসার যে রাজনীতি, এই প্রতিহিংসার রাজনীতি আমার চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে।”

এছাড়াও প্রচারিত ভিডিওতে তার গলায় থাকা ফিতায় ‘জাতীয় ছাত্রদল’ লেখা দেখা গেলেও মূল ভিডিওতে একই ফিতায় ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ লেখা ছিল।

প্রচারিত ভিডিওতে ডায়াসের সামনে একটি কাগজ বা স্ক্রিপ্ট দেখা যায়। তবে মূল ভিডিওতে ডায়াসের সামনে এ ধরনের কোনো কাগজ বা স্ক্রিপ্ট দৃশ্যমান ছিলো না। একইভাবে, প্রচারিত ভিডিওতে গলার ফিতায় ‘জাতীয় ছাত্রদল’ লেখা দৃশ্যমান হলেও ডায়াসের সামনে ‘শক্তি’ শব্দটি দেখা যায়।

ভাইরাল ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে আলিফের পেছন থেকে এসে কানে কানে বলতে দেখা যায়। এখানে এই ব্যক্তিকে চেনা না গেলেও মূল ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি জাতীয় ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি। অর্থাৎ, এডিট করার কারণে রাফির চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেছে।

ভিডিওটির বিভিন্ন অংশে এমন অসংগতিপূর্ণ দৃশ্য ও লেখার উপস্থিতি থেকে এটি সম্পাদিত বা এআই-নির্মিত কনটেন্ট বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এছাড়াও প্রচারিত পোস্টগুলোতে আরো দাবি করা হয়েছে, আলিফের দুই চোখ অন্ধ। কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়,  আলিফ পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাওয়া বা তিনি দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার দাবিটি সত্য নয়। 

গত ১৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আলিফ বলেন, “দুটি চোখের মধ্যে বাম চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে এবং ডান চোখে ইফেক্ট আছে। বেশি আলোয় দেখতে এবং দূরের কিছু দেখতে সমস্যা হয়। বর্তমানে আমি জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আছি।”